জলে ভাসা পেয়ারার হাটে পর্যটকদের ঢল


প্রকাশিত: ০২:০৫ পিএম, ২৩ আগস্ট ২০১৬

আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাস পেয়ারার মৌসুম। এসময় পাকা পেয়ারার মৌ মৌ গন্ধ নিতে এবং সবুজের সমারোহ দেখতে আসে দেশ-বিদেশের হাজারো মানুষ। স্থানটির নাম ভীমরুলী। এটা ভিয়েতনামের কোনো স্থান নয়, বাংলাদেশের দক্ষিণের একটি জেলা ঝালকাঠি।

সদর উপজেলার উত্তরদিকে ভীমরুলী গ্রাম। পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি, বরিশালের বানারীপাড়া এবং ঝালকাঠি সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী একটি গ্রাম। এটা হতে পারে ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য একটি পর্যটন কেন্দ্র।

পেয়ারার মৌসুমে নৌ-পথে ট্রলার অথবা স্প্রিটবোর্ডে এবং সড়ক পথে প্রতিদিন কয়েক হাজার দর্শনার্থী আসে সবুজের সমারোহ উপভোগ করতে। কিন্তু এখানে কোনো আবাসিক ব্যবস্থা না থাকায় অতৃপ্তি নিয়ে বিকেলে মধ্যে ফিরতে হয় ভ্রমণকারীদের।

PORJOTON

সরেজমিনে গিয়ে দেখলে মনে হতে পারে, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার বাইচ। কিন্তু তা নয়। এটি বোঝা গেল, যখন চোখটা কচলে নেয়া দুই হাতের মুষ্টি দিয়ে। আরো স্পষ্ট হলো স্টিমার বা ট্রলার ঘরানার জলযান ওই পথ মাড়ালে। কোনো প্রতিযোগ নয়, সময় ধরতে হবে। দেরি হলেই বিধিবাম।

আশপাশের অন্য সবার মতো গতি ধরে এগিয়ে চলা। হুট করেই রাজ্যে প্রবেশ। মনে হতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের কোনো নদী-খাল টপকে থাইল্যান্ড কিংবা ভিয়েতনামে এসে পড়া কিনা ! এত্ত পেয়ারা...! পেয়ারার রাজ্য! তাও আবার জলে ভেসে ভেসে! জলে ভাসা বাজার চারদিক। ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় পণ্য নিয়ে শুরু হলো বিক্রি। পানির ওপর জলজ্যান্ত একটি হাট।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত এ জলবাজারে প্রধান পণ্য পেয়ারা। সারি সারি নৌকার ওপর সবুজ-হলুদ পেয়ারা। এর ভারেই নৌকাও ডুবেছে অর্ধেক খানিক। হাটুরেদের হাঁকডাকে গম গম পুরো এলাকা। এক কথায় খালের ওপর এ এক আজব-অবাক করা বাজার।

স্থানীয়দের কাছে জানা গেল, এ অঞ্চলের ‘সবচেয়ে বড়’ ভাসমান হাট এটি ; যা পুরো বাংলাদেশেই অনন্য। এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড়! তাহলে কি আরো আছে এমন বাজার ? হ্যাঁ, আছে তো- পাশের পিরোজপুরের স্বরূপকাঠির (নেছারাবাদ) কুড়িয়ানা, আটঘর, আতা, ঝালকাঠির মাদ্রা। আরো মজার বিষয় হলো, এসবই পিরোজপুর সন্ধ্যা নদী থেকে বয়ে আসা একই খালপাড়ে।

ভীমরুলী জলে ভাসা হাটে পেয়ারা বোঝাই ডিঙি নৌকাগুলো একবার এপাশ, একবার ওপাশ, চাষিদের ভালো দামের আশায় এমন নড়চড়। খালের দুই পাশে ব্যবসায়ীদের আড়ত। তারাই কিনবেন। বাংলাদেশের সিংহভাগ পেয়ারা উৎপাদনকারী অঞ্চলের চাষিরা ডিঙিতে বসে বিকিকিনিতে মগ্ন। ভীমরুলীতে ভাসমান এ পেয়ারা হাট দেখতে এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক রিক স্ট্রিল (৬২)। ঢাকাতেই থাকেন।

PORJOTON

অস্ট্রেলিয়া থেকে বাংলাদেশে বন্ধু নিয়ে বেড়াতে এসেছেন এখানে। সঙ্গে তার স্ত্রীও রয়েছেন। সবাই মিলে ঘুরে ঘুরে দেখলেন পুরো ভাসমান বাজার। তার মন্তব্য- থাইল্যান্ড-ভিয়েতনামের বিভিন্ন বড় বড় শহরে এমন জলে ভাসা বাজারের দেখা মেলে। কিন্তু বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে জলে ভাসা বাজার-হাট গড়ে ওঠা সত্যিই অবাক করার মতো। তাও আবার জমজমাট হাট।

অর্ধবাংলায় তিনি বলেন, ‘এটি দেখতে সত্যিই চমৎকার! অদ্ভূত সুন্দর ভাসমান এ হাট ও তার আশপাশের প্রকৃতি যে কতটা নজরকাড়া হতে পারে, এটি এখানে না এলে বোঝার উপায় নেই! প্রতি বছর শত বিদেশি পর্যটক এ স্থানে ভিড় জমান পুরো পেয়ারা মৌসুম জুড়েই। বাংলাদেশিদের জন্যও যা হতে পারে অপূর্ব ভ্রমণ কেন্দ্র।

কির্ত্তীপাশা ইউপি চেয়ারম্যান আ. শুক্কুর মোল্লা বলেন, ভীমরুলীর ঐতিহ্যবাহী ভাসমান হাটে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সুপারিশ এবং বরাদ্দ চেয়ে একাধিকবার সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। কোনো বরাদ্দ না আশায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত পর্যটকদের কোনো সুযোগ-সুবিধা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

সদর উপজেলা চেয়ারম্যান সুলতান হোসেন খান বলেন, পেয়ারা সংরক্ষণের জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) আসছিল একটি কোল্ড স্টোর করার জন্য। বিলের মধ্যে কোল্ড স্টোর করার মতো জায়গা কেউ দিতে না পারায় বাস্তবায়ন হয়নি। দাবি ছিল একটি জ্যালি ফ্যাক্টরির।

সরকার তো আর জ্যালি ফ্যাক্টরী করবে না, যদি করে তা কোনো কোম্পানি। এখানে প্রচুর পরিমাণে পর্যটক আসে পেয়ারা ও ভাসমান হাট দেখতে।

রাস্তা-ঘটাও ভালো না হওয়ায়, নৌ এবং সড়ক পথে আসে পর্যটকরা। আমরা উপজেলা থেকে একটি ঘাটলা করে দেয়ার প্রস্তাব পাঠিয়েছি। সেটা অনুমোদন হলে ডুমুরিয়া-ভীমরুলীর মাঝামাঝি কোনো জায়গায় স্থাপন করা হবে। কীর্ত্তিপাশায় একটি স্পট করে দেয়ার চিন্তা ভাবনা আছে। যেখান থেকে পেয়ারাবাগের ট্রলার ছাড়বে।

এআরএ/এবিএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।