ভাবির প্রতারণায় ক্ষুব্ধ হয়ে মাধবপুরে তিন খুন
অভাব আর বিদেশ যেতে না পারার হতাশার মাঝে ভাবির প্রতারণা আর উপহাসের শিকার হয়ে খুনের সিদ্ধান্ত নেন তাহের উদ্দিন এলাইছ ওরফে শাহ আলম। শুধু ভাবিকে খুন করতে গেলেও অন্যরা সামনে এসে পড়ায় তাদেরও খুন করেন তিনি।
হবিগঞ্জে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শামসাদ বেগমের খাস কামড়ায় বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন শাহ আলম। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এদিকে তিন খুনের ঘটনায় নিহত জাহানারা বেগমের ভগ্নিপতি হাজি মো. মোহন মিয়া বাদী হয়ে সকালে মাধবপুর থানায় শাহ আলমকে একমাত্র আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। অপরদিকে দুপুরে নিহত তিনজনের ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শাহ আলমের জবানবন্দির বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ১১ বছর তিনি কুয়েত এবং গ্রিসে প্রবাসী ছিলেন। সেখান থেকে তিনি তার ভাবি জাহানারা বেগমের কাছে উপার্জিত অর্থ পাঠান। প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে তিনি গ্রিস থেকে দেশে ফেরেন। এরপর থেকে তার পাঠানো টাকা ফেরত চেয়ে ব্যর্থ হন।
ভাবি তার কোনো টাকা ফেরত দেননি। এমনকি সম্পত্তির ভাগেও তাকে ঠকিয়েছেন। এ অবস্থায় প্রায় দুই/আড়াই বছর ধরে ভাবির সঙ্গে তার কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। কিন্তু সময়ে অসময়েই ভাবি তাকে উপহাস করে কথা বলেন। এরই মাঝে তিনি বিয়ে করেন। তার একটি সন্তানও হয়। আর্থিক কষ্টে তিনি স্ত্রী, সন্তান নিয়ে দৈন্যতার মাঝে দিনাতিপাত করছিলেন।
সম্প্রতি তিনি আবারো ইরাক যাওয়ার জন্য চেষ্টা করছিলেন। ১৯ আগস্ট তার ফ্লাইট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফ্লাইট হবে না জানতে পেরে ১৮ আগস্টই তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। তখন থেকে ভাবির উপহাসের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। মঙ্গলবার বিকেলে তিনি স্থানীয় বাজারে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন। এসময় ভাবি জাহানারা বেগম তাকে উদ্দেশ্য করে নিজের মেয়ে শারমিন আক্তারকে উপহাস করে বলেন, তোমার আর বিদেশ যাওয়া হবে না।
একাধিকবার এমন বলার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন ভাবিকে খুন করবেন। রাতে রান্নাঘর থেকে ছুরা নিয়ে ভাবির ঘরে ঢুকে তাকে আঘাত করতে থাকেন। এসময় বিদ্যুৎ চলে যায়। মায়ের চিৎকার শুনে তার মেয়ে শারমিন এবং ছেলে সুজন এগিয়ে এসে জাহানারাকে জড়িয়ে ধরলে তাদেরও ছুরিকাঘাত করেন শাহ আলম। ছুটে আসেন শাহ আলমের বৃদ্ধা মাও।
অবস্থা দেখে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি। তাদের চিৎকারে প্রতিবেশী শিমুল মিয়া এসে এমন অবস্থা দেখে ঘরে থাকা একটি শাবল শাহ আলমের দিকে ছুড়ে মারেন। তখন ক্ষুব্ধ হয়ে শিমুল মিয়াকেও তিনি ছুরিকাঘাত করেন। আহতদের মাঝে জাহানারা বেগম ঘটনাস্থলেই মারা যান। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পথে শিমুল মিয়া এবং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়ার পর শারমিন মারা যান। গুরুতর আহত অবস্থায় সুজন মিয়াকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম পলাশ জানান, শাহ আলম স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিয়েছেন। এ হত্যাকাণ্ড তিনি একাই ঘটিয়েছেন। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে ভাবিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ঘটনার সময় অন্যরা এসে পড়ায় তাদেরও হত্যা করতে বাধ্য হন তিনি।
খরব পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পুলিশ সুপার জয়দেব কুমার ভদ্র। তিনি জানান, শাহ আলম হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি মূলত ভাবিকেই হত্যা করতে চেয়েছিলেন। কারণ ভাবি তার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন পাশাপাশি উপহাসও করতেন। কিন্তু ঘটনার সময় অন্যরা ছুটে আসায় তারাও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রাথমিক তদন্ত এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ যা পাওয়া গেছে, তাতে শাহ আলম ছাড়া অন্য কেউ এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে বুধবার দুপুরে নিহত তিনজনের ময়নাতদন্ত করা হয় হবিগঞ্জ আধুনিক সদর হাসপাতালে। ময়নাতদন্ত শেষে তাদের মরদেহ স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়।
সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন/এআরএ/এবিএস