সরদার টাকা নিয়ে ফিরলেই ঈদ করতে পারুম


প্রকাশিত: ০২:৪৬ পিএম, ২৮ আগস্ট ২০১৬

‘চরে ৪৫ জনের একটা লেবার গ্রুপ আছে। আমরা দিনাজপুরে ইটভাটায় কাজ করি। মহাজনের কাছে ফোন করছি, আমাগো কাজের জন্য অ্যাডভান্স টাকা দিতে। সরদার টাকা নিয়ে ফিরলেই সবাই দুই থেকে তিন হাজার টাকা করে পামু। তাই দিয়ে ঈদ করুম। পরে কাজ করে টাকা পরিশোধ করে দিমু’ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের অনন্তপুর দাগারকুটি চরের দিনমজুর ভেলু মিয়া।

ঠিক এভাবেই কাটবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বানভাসিদের ঈদ। সেই সঙ্গে শ্রম বিক্রি ও ধারের টাকায় ঈদ পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে গ্রামের বানভাসিরা। টানা বন্যায় পরিবার নিয়ে বাড়িতে আটকে পড়ায় মজুরি দিতে না পারায় চরাঞ্চলের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তারপরও সন্তানদের দিকে তাকিয়ে তারা ধারদেনা করে ঈদ পালন ও সংসার চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সরেজমিন কুড়িগ্রামের বিভিন্ন চর ঘুরে দেখা যায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেই ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছেন তারা।

জেলার উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের গাবুরজান চরের ছরমত আলী বলেন, ‘পোলাপানগো লইয়া খুব দুশ্চিন্তায় আছি। ভাবতাছি হাঁস-মুরগি বেইচায়ে পোলাগো জামা কিইন্না দিমু।’

পাশের অনন্তপুর দাগারকুটি চরের দিনমজুর আজাহার বলেন, ‘টানা বানের পানিতে বাড়িতে আটকা ছিলাম। ঠিকমতো কাম কাজও হয় নাই। সুদের পর টাকা লইয়া ঈদ চালাতে হইবো। পরে দেহা যাবে কি হয়।’

ঠিক তাদের মতোই আগাম শ্রম আর সুদের টাকায় ঈদ পালনের চিন্তা-ভাবনা করছে একই চরের অধিকাংশ ভানবাসি।

দেশের উত্তর সীমান্ত এবং ১৬টি নদ-নদী দ্বারাবেষ্টিত জেলা কুড়িগ্রাম। প্রতি বছর বন্যা, খরা, নদী ভাঙন আর শৈত্যপ্রবাহ জেলার উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। তবুও বন্যার বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে থাকা এসব মানুষ সব প্রতিকূলতাকে পেরিয়ে সামনে এগিয়ে চলার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।

বন্যার সময় বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ায় এসব চরের মানুষ পানিবন্দি জীবনযাপন করে। যতক্ষণ পানি থাকে, ততক্ষণ তাদের অসহায় অবস্থায় প্রহর গুণতে হয়। এ সময় কাজকর্ম কিছুই থাকে না। ফলে অবরুদ্ধ দিনমজুর শ্রেণির মানুষগুলোকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। বিক্রি করে দিতে হয় সহায় সম্বল।

এসব মানুষের কাছে ঈদ মানে বাড়তি বোঝা। বাড়তি খরচ। কিন্তু সামাজিকতা বজায় রাখতে গেলে, পরিবারের সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে গেলে তাদেরও জামা কিনে দিতে হয়। করতে হয় ভালোমন্দ কিছু খাবারের ব্যবস্থাও। কোরবানি না দিলেও মাংস কিনে আনতে হয়।

যাত্রাপুর আরাজি পিপুলবাড়ি চরের শিশু ফেরদৌস, আজিত ও মুকুল বলে, রিদে বলে (ঈদে) নয়া জামা পড়মু। বাবায় কিন্না দিবো। গরুর গোস্ত দিয়া ভাত খামু। অনেক মজা হইবো। এই চরের মহিদুল মুখ কালো করে বলে, ‘আমাগো বাপের অসুক হইছে। হেই রিদে কিছু কিইন্না দিবো না।’

চরের নারীদের কাছে ঈদ একটা আলাদা আনন্দ হলেও স্বামীদের কষ্টের জীবনের সঙ্গে তাদের মানিয়ে চলতে হয়। সারা বছর সবার অগোচরে অনেক কষ্ট করে জমানো সামান্য টাকা স্বামীদের হাতে তুলে দেয় একবেলা পেটপুরে খাবারের জন্য। একটুখানি আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য। এভাবেই চলে চরের মানুষের ঈদ। গোটা দেশের একপ্রান্তে বসবাস করা এসব মানুষ এ নিয়ে কোনো হতাশা বা অভিযোগ করে না। তারা তাদের সামান্য সামর্থ্য দিয়েই ঈদ আনন্দ উৎসব পালন করে।

হাতিয়া ইউপি চেয়ারম্যান এবিএম আবুল হোসেন এবং যাত্রাপুর ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার জানান, জেলার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। এই অঞ্চলের মানুষের হাতে সারা বছর কাজ থাকে না। বন্যায় এসব দিনমজুর বা শ্রমিকদের বেকার বসে থাকতে হয়। বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে তাদের কষ্ট মারাত্মক আকার ধারণ করে। যার কারণে এবারের ঈদেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। অনেকেই ঋণ বা সুদের ওপর টাকা নিয়ে ঈদ করবে।

চেয়ারম্যানরা আরো জানান, এই এলাকার মানুষ সাহায্য কিংবা রিলিফ চায় না। তারা চায় শুধু কর্মসংস্থান। পাশাপাশি নদ-নদী ভাঙন রোধে প্রশাসনকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তারা।

নাজমুল হোসেন/এএম/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।