তাহিরপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটনের স্বর্গরাজ্য


প্রকাশিত: ১২:১০ পিএম, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬

দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলা ভাটির জনপদ হিসেবে পরিচিত হলেও প্রাকৃতিক সম্পদ আর নান্দনিক সৌন্দর্যে ভরপুর।

যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এ উপজেলা থেকে সরকারের রাজস্ব ভাণ্ডারে প্রতি বছর কয়েকশ কোটি টাকা জমা পড়লেও আজো রয়েছে অবহেলিত।

তাহিরপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রতিনিয়ত পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। পর্যটকদের ভ্রমণকে আনন্দদায়ক ও সার্থক করে তোলে এ উপজেলার প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম দৃশ্য।

Tahirpur

জেলা সদর থেকে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের কুলঘেঁষা সীমান্ত ও হাওরাঞ্চল উপজেলা তাহিরপুর।

টাঙ্গুয়ার হাওর : আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি দেশের জলচর পরিযায়ী পাখির সবচেয়ে বড় বিচরণক্ষেত্র মাছের অভয়াশ্রম টাঙ্গুয়ার হাওর, যা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ রামসার সাইট হিসেবে পরিচিত। হাওরের উত্তর দিগন্তে মেঘছোঁয়া তিন-চার হাজার ফুট উচ্চতার সবুজ মেঘালয় পাহাড় রয়েছে। এখানে শাপলা ফোঁটা জলে দল বেঁধে নানা প্রজাতির পাখিরা ডুব-সাঁতারে গুগলি শামুক খায় প্রতিনিয়ত। হেমন্তে কোমরে খলই বাঁধা কাঁধে ঠ্যালা জাল নিয়ে দল বেঁধে জলাশয়ের দিকে মৎস্য আহরণ করতে হাঁটা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায় পর্যটকদের।

দিগন্ত ছোঁয়া তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার বিস্তীর্ণ ৯ হাজার ৭২৭ হেক্টর এলাকাজুড়ে (নয়কুড়ি কান্দা, ছয়কুড়ি বিল) বিস্তৃত ২৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ৫২টি বিলের সমন্বয়ে এই টাঙ্গুয়ার হাওর গোধুলির সোনালি মেঘে যেন রোমান্টিক হয়ে ওঠে।

Tahirpur

ফুরফুরে বাতাসে নৌকার ছইয়ে বসে দোলা খাওয়া পর্যটকদের একটা মনোরম মাত্রা এনে দেয়।

হাওরে ভাসতে থাকা সূর্যোদয়ের লোহিত আলোয় হিজল, করচসহ বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ-গুল্ম অতিথি পাখিদের কলরবে মুগ্ধ করে তোলে। পাখিদের কিচির-মিচির কলতানে সৃষ্টি হওয়া আবহ পাখিপ্রেমীদের সহজেই নিয়ে যায় অন্য এক ভুবনে।

এসব পাখির কিচির-মিচির কলধ্বনিতে ঘুম ভাঙে হাওর পাড়ের ৮২টি গ্রামের মানুষের। সব মিলিয়ে নিসর্গের অপূর্ব আকর্ষণ টাঙ্গুয়া। এ যেন পর্যটনের স্বর্গরাজ্য।

এদিকে প্রতিদিন শত শত পর্যটকের আগমন ঘটলেও থাকা খাওয়ার মনোরম পরিবেশ নেই কোথাও। অবকাঠামোগত উন্নয়ন না থাকার ফলে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটন শিল্পে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।

অন্যদিকে টাঙ্গুয়ার হাওর, যাদুকাটা নদী, বারেকটিলা, টেকেরঘাট চুনাপাথর খনিজ প্রকল্প (বর্তমানে পরিত্যক্ত) এলাকার খননকৃত কোয়ারি, শাহ আরেফিন (র.) মোকাম, হাওলি জমিদার বাড়ি, অধৈত প্রভুর মন্দিরসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান পর্যটকদের কাছে তুলে ধরতে এবং পর্যটন উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবিতে চলতি মাসের ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর দুই দিনব্যাপী জোৎস্না উৎসবের আয়োজন করেছে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন।

Tahirpur

দুই দিনব্যাপী উৎসবে থাকছে ৫০টি নৌকা ও লঞ্চযোগে পর্যটকদের নিয়ে হাওর ঘুরে দেখা এবং রাত্রীযাপন। থাকবে বিনোদনের ব্যবস্থা।

ইতোমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। দেশের যে কোনো স্থান থেকে এ উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পর্যটক ও ভ্রমণপিয়াসীদের আহ্বান জানিয়েছে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসন।

এ ব্যাপারে উৎসবের পরিকল্পনাকারী তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিদিন শত শত মানুষ টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে আসে। পর্যটন অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে তারা হাওরের ও অন্যন্য সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন না। কারণ এখানে নেই থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা। আমরা এই উৎসবের মাধ্যমে একদিকে পর্যটন সম্ভাবনাকে তুলে ধরতে চাই, অপরদিকে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানাবো।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্ত থেকেই নামমাত্র খরচে এই উৎসবে যোগ দিতে পারবেন যে কেউ।

এ প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হারুন অর-রশিদ বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে এমন একটি আয়োজন পর্যটনের জন্য আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে তাহিরপুর উপজেলাকে।

টাঙ্গুয়ার হাওরে জোৎস্না উৎসবের আয়োজকদের সাধুবাদ জানিয়ে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম হাওরের পরিবেশ রক্ষার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ৯৭ দশমিক ২৯ বর্গ কিলোমিটার দৈঘ্য আয়তনের এই অনন্য জলাভূমিতে ৫২টি বিল ও ১২০টি কান্দা রয়েছে। ১৪১ প্রজাতির মাছ, ২০০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২১৯ প্রজাতির পাখি, ৯৮ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি, ১২১ প্রজাতির দেশীয় পাখি, ২২ প্রজাতির পরিযায়ী হাঁস, ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণি, ২৯ প্রজাতির সরিসৃপ, ১১ প্রজাতির উভচর, অসংখ্য জলজ, স্থলজ ও জীববৈচিত্র্য রয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওরে।

Tahirpur

বারেকটিলা : যাদুকাটা নদীর খেয়া পেরুলেই দেখা যাবে নদীর পশ্চিম তীর ঘেঁষে রয়েছে নয়নাভিরাম প্রায় ৩শ ফুট সুউচ্চ (৩৫৬ একর) বারেকটিলা। নদীর তীর থেকে পাহাড়ি আঁকা-বাঁকা উঁচু পথ বেয়ে টিলার উপর উঠলে চোখে পড়ে ঘন সবুজের সমাহার আর সারি সারি ফলদ, বনজ ও ওষুধী গাছ।

এখানে রয়েছে কড়ইগড়া ও রাজাই নামে দুটি আদিবাসী গ্রাম। তাদের নিজস্ব সংস্কৃতির একটি র্গিজা। আদিবাসীরা আপনাকে পুরো গ্রাম ও পাহাড় ঘুরে দেখাতে সাহায্য করবে। এরা খুব পরিশ্রমী ও অতিথিপরায়ণ। ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বাংলা বলার ভঙ্গিটা যে কাউকেই আর্কষণ না করে পারে না। পাহাড়ের উপর বাংলাদেশ বর্ডার র্গাড জওয়ানদের টহলের জন্য রয়েছে একটি উঁচু মিনার। যা পর্যটকদের আরও কাছে টানে। টিলার উপর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে তাকালে মনে হয় পুরো উপজেলাটি নিজের হাতের মুঠোয়। যেন বাংলার আইফেল টাওয়ার। টিলা থেকে একটু দক্ষিণ দিকে চোখ মেলালে দেখা যায় দেশের সবচেয়ে বড় শিমুল বাগান আলহাজ জয়নাল আবেদীন গার্ডেন।

টেকেরঘাট চুনাপাথর খনিজ প্রকল্প : এখানকার নিঝুম প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে যাবে এক কাব্যময় ভুবনে। ছোট ছোট টিলা আর ছায়াময় বৃক্ষঘেরা পুরো খনি প্রকল্পটি ঘুরে দেখলে নয়ন জুড়িয়ে যাবে। টেকেরঘাট চুনাপাথর খনিজ প্রকল্প (বর্তমানে বন্ধ) রয়েছে। এক সময় ছাতক সিমেন্ট কোম্পানির কাঁচামাল এখান থেকে সরবরাহ করা হতো। আছে একটি রেস্টহাউজ। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীরবিক্রম সিরাজের সমাধি।

এমএএস/এবিএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।