সঙ্কটের অপর নাম পিরোজপুর সদর হাসপাতাল


প্রকাশিত: ০৫:২৭ এএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬

পিরোজপুরে চিকিৎসকদের মঞ্জুরীকৃত পদের তিন ভাগের দুই ভাগ পদই শূন্য রয়েছে। ফলে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে পিরোজপুরের স্বাস্থ্য সেবা। চিকিৎসকরাও রোগীদের যথাযথ সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। পাশাপাশি রোগীরা তাদের যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
 
পিরোজপুর জেলার স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান এবং সদর হাসপাতাল ও ছয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমেপ্লেক্সে ডাক্তারদের জন্য মোট ১৭০টি মঞ্জুরীকৃত পদ রয়েছে যার মধ্যে পূরণকৃত পদ ৭৮টি এবং শূন্য রয়েছে ৯২টি পদ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ৩১ জন চিকিৎসকের মধ্যে আছেন মাত্র ১০ জন। জেলার অন্যান্য উপজেলার চিত্রও একই। কাউখালী উপজেলার স্বাস্থ্য কমেপ্লেক্সে সরকারি মঞ্জুরীকৃত ৯টি পদ থাকলেও বর্তমানে আছেন মাত্র ৪ জন চিকিৎসক। তার মধ্যে আবার দুইজন নিয়মিত।

জিয়ানগরে ১০টির মধ্যে ৫টি, স্বরুপকাঠীতে (নেছারাবাদে) ২৯টির মধ্যে ১৩টি, ভান্ডারিয়ায় ১৫টির মধ্যে ৭টি, নাজিরপুরে ১৭টির মধ্যে ৯টি এবং মঠবাড়িয়ায় ২১ টির মধ্যে ৯ জন রয়েছেন।

তথ্যানুসন্ধ্যানে জানা গেছে, এ জেলার প্রায় ১৩ লাখ মানুষের চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান পিরোজপুর সদর হাসপাতালে দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা অনেক রোগী সম্পূর্ণ চিকিৎসা না নিয়েই হাসপাতাল থেকে চলে যান। দীর্ঘদিন যাবত জেলার ঐতিহ্যবাহী ১০০ শয্যার এ হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে চিকিৎসক না থাকার কারণে স্বাস্থ্য সেবায় বিঘ্ন
 
এছাড়া হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে ৫০ শয্যার লোকবল দিয়ে। ফলে এই জেলার অসংখ্য গরীব রোগী যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ৩শ, ১শ ও ৫০ এম.এ ক্ষমতাসম্পন্ন এক্সরে মেশিন সচল থাকেলেও ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের ১শ ও ৩৮ এম.এ ক্ষমতাসম্পন্ন এক্স-রে মেশিন অচল রয়েছে।

আবার যে ৩টি সচল রয়েছে তা অ্যানালগ হওয়ায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের ছুটতে হয় ডিজিটাল এক্সরে মেশিনের দিকে। এছাড়া সঙ্কট রয়েছে অক্সিজেন সিলিন্ডারেরও।

হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্সটি পুরানো হওয়ায় চিকিৎসা সেবা দিতে ভোগাান্তি হচ্ছে। এছাড়া সরকারি হাসপাতালে রোগী এলেই ডাক্তারা ব্যবস্থাপত্রে এক্সরে, আলট্রাসনো গ্রাফি, রক্ত ও মূলমূত্র, পরীক্ষার কথা লিখে দেন। ফলে রোগীদের বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।
 
হাসপাতালের টিকিট বিক্রয় কেন্দ্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫০-৩০০ জন এবং জরুরি বিভাগে ৪০-৫০ জন রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসে। তবে হাসপাতালের চাহিদা অনুযায়ী লোকবল পাওয়া গেলে সেবার মান আরও বাড়বে। সেইসঙ্গে এই এলাকার গরীব রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিতে ঢাকা, খুলনা কিংবা বরিশালে যেতে হবে না বলে মনে করেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

অভিযোগ রয়েছে, চাহিদা অনুযায়ী সরকারিভাবে ওষুধ সরবরাহ করা হলেও ৯৫ ভাগ ওষুধ পাচার হয়ে যায়। অপরদিকে হাসপাতালের দালাল চক্রের সহযোগিতায় চিকিৎসকরা হাসপাতালে বসেই চিকিৎসা বাণিজ্য চালাচ্ছেন। ময়নাতদন্ত ও মেডিকেল পরীক্ষা নিয়েও পড়তে হয় নানা সমস্যায়।

সদর উপজেলার জুজখোলা থেকে বৃদ্ধ মা অজিফা খাতুনকে (৬০) নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন মেয়ে শাহনাজ বেগম। অজিফা খাতুন শ্বাস কষ্টের রোগী। টিকিট পাওয়ার জন্য কাউন্টারের সামনের উপচে পড়া ভিড়ে শাহনাজের অবস্থাও শোচনীয়।

জিজ্ঞেস করতেই শাহনাজ এ প্রতিবেদককে জানান, দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাউন্টার থেকে কোনো টিকিট পাচ্ছি না। মা শ্বাস কষ্টের রোগী, তাকে ওখানে বসিয়ে রেখেছি।

প্রধান ফটকের দেখভাল করার জন্য রয়েছে একজন অস্থায়ী দারোয়ান। তিনিও ব্যস্ত নিজের সাজানো পশরার মালামাল বিক্রির কাজে।

সদর হাসপাতালের তথ্য সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উক্ত হাসপাতালকে ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সৃষ্টি করা হয়নি এ হাসপাতালের ১০০ শয্যার পদ। ৩১ জন ডাক্তারের জায়গায় রয়েছে মাত্র ১০ জন ডাক্তার। হাসপাতালে রোগীর তুলনায় নার্সের সংখ্যা অপ্রতুল হলেও কোটা অনুযায়ী ৩৮ জন নার্সের বিপরীতে রয়েছে ৩৫ জন নার্স।

৩য় শ্রেণির ৩৬ জনের বিপরীতে রয়েছে ২৭ জন এবং ৪র্থ শ্রেণির ৪২ জনের বিপরীতে ২১ জন কর্মচারী থাকলেও তা অপ্রতুল।

১০০ শয্যার হাসপাতালের চাহিদা অনুযায়ী তারা ১ম শ্রেণির সর্বমোট ৩৬ জন কর্মকর্তার দাবি করেছেন। ২য় শ্রেণির জন্য সর্বমোট ৩৯ জন, ৩য় শ্রেণির জন্য সর্বমোট ৬২ জন এবং ৪র্থ শ্রেণির জন্য সর্বমোট ৭২ জন কর্মচারীর জন্য আবেদন করেছেন তারা।

হাসপাতালের লোকবল বাড়ানো সম্পর্কে উক্ত হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা (ভারপ্রাপ্ত) আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ননী গোপাল রায় জানান, তারা লোকবল বাড়ানোর জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরে আবেদন পাঠিয়েছেন।

হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য নেই কোনো সিকিউরিটি গার্ড। যা রোগী ও হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য খুবই জরুরি।

হাসপাতালে দীর্ঘদিন থেকে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ, জুুনিয়র কনসালটেন্ট না থাকায় তারা রোগীদের ওই সকল বিভাগের সুবিধা দিতে পারছেন না।

আরএমও আরও জানান, উক্ত হাসপাতালের লোকবল সঙ্কট থাকার কারণে তাকে একইসঙ্গে কারাগার ও এনেসথেসিয়ান, সদর হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল (আরএমও) অফিসার ও ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র স্বাস্থ্য কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছে।

হাসপাতালের আগত রোগীদের বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি থাকলেও তার উপযুক্ত প্যাথলজিস্ট না থাকায় তারা রোগীদের বিভিন্ন ধরনের প্যাথলজিক্যাল সেবা প্রদান করতে পারছেন না। তাই রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে বাইরের প্যাথলজি থেকে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়।

হাসপাতালে রোগীদের ঔষধ সরবরাহের ব্যাপারে তিনি বলেন, হাসপাতালে যখন যে ধরনের ঔষধের সরবরাহ থাকে তখন সেগুলোই রোগীদের দেওয়া হয়। তবে রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত ঔষধ দেওয়া যাচ্ছে না বলেও তিনি জানান।

এসব ব্যাপারে সিভিল সার্জন (সিএস) ডা. মুহা. ফকরুল আলম জানান, পিরোজপুর সদর হাসপাতালে যে পরিমাণ লোকবল রয়েছে তা রোগীদের চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

সরকারি সহযোগিতা পাওয়ার ব্যাপারে সিভিল সার্জন বলেন, তারা বার বার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে শূণ্য পদ পূর্ণ পূর্বক লোকবল বাড়ানোর আবেদন করেছেন। ডাক্তারদের শূণ্য পদের ব্যাপারেও ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

এফএ/এবিএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।