মাদারীপুরে শহীদদের পরিবারের খোঁজ রাখে না কেউ
অস্ত্রের মুখে দমে যায়নি বরং বুকের তাজা রক্তে লেখেছে একটি নাম ‘বাংলাদেশ’। সেই রক্তের দাগ শুকিয়ে গেলেও আজ আর কেউ খোঁজ রাখে না মাদারীপুরের সেসব শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারগুলোকে।
জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধে মাদারীপুরে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হয় ৪৩ জন। স্বাধীনতার এতো বছরেও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে তাদের নাম তালিকাভুক্ত হয়নি। বছরে দিবস পালনের নামে এক দুবার সৌজন্য সাক্ষাৎ করে সরকারি কর্মকর্তারা। এতে ক্ষুদ্ধ শহীদ পরিবারের স্বজনরা। তারা চান, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা। তাদের সঙ্গে একমত স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারাও।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশ ও মাটির টানে বসে থাকতে পারেনি মহসীন মাস্টার। একাত্তরের সেই দিনে ঝাপিয়ে পড়েন শত্রুর প্রাণহরণের জন্যে। তবে বেশি দিন শক্রকে খতম করতে পারেননি। যুদ্ধের আড়াই মাসের মাথায় ১৫ জুন গোপালগঞ্জের ‘দিগনগর’ এলাকায় সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন মহসীন মাস্টার।
তিনিই মাদারীপুর জেলার প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। তবে এতো বছরেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি মহসীন মাস্টারের পরিবার। এক সময়ে প্রতি মাসে দুই হাজার টাকা আর্থিক অনুদান দিলেও তিন যুগ আগে তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন শুধু বছরে ‘স্বাধীনতা আর বিজয়’ দিবসে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে জেলা প্রশাসন।
এখন আর্থিক অভাব-অনাটনে চলে মহসীন মাস্টারের পরিবার। এই বীরের পরিবারের দাবি একটাই, তার বাবাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে তালিকাভুক্ত করা হোক।
শহীদ মহসীন মাস্টারের ছেলে মজিবর রহমান বলেন, এক সময়ে আমরা দুই হাজার করে সরকারি অনুদান পেতাম। কিন্তু এখন প্রায় আড়াই যুগ ধরে কোন আর্থিক সহযোগিতা পাই না। মুক্তিযোদ্ধরা যদি সরকারি সহযোগিতা পেতে পারেন, তাহলে আমরা কেন শহীদ পরিবার হিসেবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাবো না। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, অন্তত রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের শহীদ পরিবার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হোক।
শুধু শহীদ মহসীন মাস্টারের পরিবারই নয়, মাদারীপুরে সম্মুখযুদ্ধে আরও শহীদ হন ৪৩ জন মুক্তিযুদ্ধা। তাদেরও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। ফলে এসব পরিবার অনেকটা হতাশ। এসব পরিবারের দাবি, মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যায় তাদেরও রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা দেয়ার।
মাদারীপুরের সমাদ্দারের সম্মুখযুদ্ধে শহীদ সরোয়ার হোসেন বাচ্চুর ছোট চাচা মুক্তিযোদ্ধা হারুন অর রশিদ বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। নিজের দেশকে শক্র মুক্ত করার জন্য লড়েছি। কোন আর্থিক অনুদান পাওয়ার জন্য যুদ্ধ করিনি। তবে রাষ্ট্র তা স্বীকার করলে আমাদের বুকটা ভরে যায়। আমাদের দাবি, শহীদদের কবরগুলো সারাদেশে একইভাবে একই ডিজাইনে যেন করা হয়। শহীদ পরিবারগুলোকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও মর্যদা দেয়া হয়।
শহীদ মুক্তিযুদ্ধাদের নামের তালিকা করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার সঙ্গে একমত মাদারীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট। সদর উপজেলা ইউনিট কমান্ডার আব্দুল খালেক দাবি করেন, সেনা সদস্যদের হাতে শহীদ অন্য গণশহীদেরও তালিকা করার।
এ বিষয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শাহাজান হাওলাদার বলেন, জেলায় ৭৫ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম থাকলেও যাচাই-বাছাই করে আরও ৪৩ জনের নাম মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অচিরেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হবে। তখন আমরা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে তাদের নামের তালিকা প্রকাশ করতে পারবো।
যাদের তাজা রক্তে এদেশ স্বাধীন হয়েছে। তাদের সম্মানে এসব শহীদ পরিবারকে সহযোগিতার দাবি মাদারীপুরবাসীর। তাদের দাবি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া শহীদ পরিবারগুলোকে যেন স্বীকৃতি ও যথাযথ মর্যদা দেয়া হয়।
একেএম নাসিরুল হক/এএম