চিকিৎসার অর্থাভাবে সন্তানের মৃত্যুর অনুমতি চেয়ে বাবার আবেদন
ডুসিনি মাসকুলার ডিসট্রোফি, যার ওষুধ বিশ্বে এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। এ রোগে আক্রান্ত মেহেরপুর শহরের বেড়পাড়ার তোফাজ্জেল হোসেনের পরিবারের তিন সদস্য। চিকিৎসা করতে গিয়ে হারিয়েছেন জমিজমা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ নগদ অর্থ। সবকিছু হারিয়ে গত বৃহস্পতিবার এ রোগে আক্রান্ত দুই ছেলে ও এক নাতির মৃত্যুর অনুমতি চেয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেন তিনি।
তোফাজ্জেল হোসেনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার দুপুরে তার বাড়ি পরিদর্শন করেছেন মেহেরপুর জেলা প্রশাসক পরিমল সিংহ। তিনি পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তাদের কিছু ব্যয়বহনের ঘোষণা দেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। আবেদনটি পড়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। এই পরিবারের জন্য আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করবো। সমাজের সবাইকে অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
পিজি হাসপাতালের নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এ এস এম হাসান আলী মাসুম জানান, ডুসিনি মাসকুলার ডিসট্রোফি একটি জিনগত রোগ। মেয়েরা এ রোগের বাহক। আক্রান্ত হয় শুধু ছেলেরা। ছেলেদের ৫ থেকে ৬ বছরের মধ্যে এ রোগ দেখা দিতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমে ভর দিয়ে হাঁটতে পারবে না। উপরে উঠতে পারে না। শরীরের মাংসপেশিগুলো নিস্তেজ হয়ে আস্তে আস্তে পঙ্গু হয়ে যাবে। ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে মারা যেতে পারে। এ রোগের প্রতিষেধক আজ পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি।
ক্যান্সারের চেয়েও এ রোগ ভয়াবহ উল্লেখ করে কয়েকজন শিশু বিশেষজ্ঞ বলেছেন, আক্রান্তের শরীরে সব অংশের মাংসপেশি আস্তে আস্তে জমাট বেঁধে যাবে। চলাফেরা বন্ধের সঙ্গে সঙ্গে কথা বলার শক্তিও হারিয়ে যাবে। তাই চিকিৎসায় সুফল মিলবে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়বে যন্ত্রণাও।
ভারতের একজন স্বনামধন্য হোমিও চিকিৎসক তোফাজ্জেল হোসেন বলেন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় এ রোগ সারিয়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু অর্থের অভাবে সেখানে সন্তানদের নিয়ে যেতে পারছেন না তোফাজ্জেল হোসেন। শেষ চেষ্টা হিসেবে তিনি সেখানে নিয়ে যেতে চান। তাই সন্তানদের ভরণ-পোষণ ও চিকিৎসার জন্য সহৃদয়বান ব্যক্তিদের কাছে সাহায্যের আবেদনও করেছেন।
স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার
স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। সে স্বপ্ন বুকে লালন করে বিদ্যালয়ে যেতে শুরু করে মেহেরপুর শহরের বেড়পাড়ার তোফাজ্জেল হোসেনের ছেলে সবুর। ২য় শ্রেণি পর্যন্ত ভালোভাবেই পড়ালেখা করে সে। কিন্তু সবুরের সব আশা ম্লান করে দেয় দুরারোগ্য রোগ ডুসিনি মাসকুলার ডিসট্রোফি। ওই সময়ই পায়ের শক্তি হারায় সে। বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক বছর পর শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে। 
শুধু সবুরই নয়, কয়েক বছর পর এ রোগে আক্রান্ত হয় তার ছোট ভাই রাইহানুল ইসলাম। এ বছরই নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে তার ভাগ্নে সৌরভ। সবুরের বয়স এখন ২৪, রাইহানের ১৩ ও সৌরভের ৮ বছর।
ছোট শিশু সৌরভের দুরন্তপনা দেখে মনে হয় না সে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত। কখনও সাইকেল চালিয়ে, কখন ক্রিকেট খেলে আবার বন্ধুদের সঙ্গে হৈ-হুল্লোড় করে সময় পার করছে সে। অথচ সে জানে না কয়েক বছর পর শারীরিক সব সক্ষমতা হারিয়ে মামাদের সঙ্গে স্থান হবে বিছানায়।
কারোরই মৃত্যু কামনা কার উচিত নয়। অথচ দুই ছেলে ও এক নাতির মৃত্যুর অনুমতি চেয়ে মেহেরপুর জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেছেন তোফাজ্জেল হোসেন। দুরারোগ্য রোগ ডুসিনি মাসকুলার ডিসট্রোফি রোগে আক্রান্ত তার পরিবারের চিকিৎসা ও নিজের সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। 
অথচ শহরের প্রাণকেন্দ্র বড়বাজারে একটি বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল তার। ২০০১ সাল থেকে এ ব্যাধিতে আক্রান্ত তিন সদস্যের ব্যায়ভার বহন করতে গিয়ে হারিয়েছেন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নগদ অর্থ ও দুই বিঘা জমি। শুধু দেশেই নয়, চিকিৎসা করেছেন ভারতের বিভিন্ন চিকিৎসকের কাছেও। এখন সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব তিনি।
চিকিৎসার ব্যয়ভার দূরের কথা সংসার চালানোর মতো সক্ষমতাও তার নেই। সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি। আর একমাত্র মেয়ের দাবি সংসার বাঁচাতে একটি চাকরির।
সন্তানদের চিকিৎসার জন্য তোফাজ্জেল হোসেন দেশের বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, দূতাবাসেও ছুটে গেছেন। ঢাকায় ফ্রান্স দূতাবাস সহযোগিতা দিতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের কাছে এ রোগের ওষুধ কী জানতে চায়। শত শত চিকিৎসক ইন্টারনেটে জানিয়েছেন, এখনো এই রোগের কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। ফলে তোফাজ্জেল হতাশ হয়ে পড়েন।
তোফাজ্জেল হোসেনের চোখে এখন শুধুই পানি। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি চোখের পানিতে বুক ভাসাচ্ছেন। কিন্তু উপায় মিলছে না। উপরন্তু চোখের সামনে নিভে যেতে বসছে দুই সন্তান ও নাতির জীবন প্রদীপ।
এফএ/পিআর