‘সে আমারে বদর বানাইছে, ওর ফাঁসি দেইক্কা মরবার চাই’


প্রকাশিত: ১০:৫৭ এএম, ০৬ এপ্রিল ২০১৫

আমি মুক্তিযুদ্ধে যাবার চাইছিলাম। কিন্তু, কামরুজ্জামান আমার জীবনডারে ধ্বংস কইরা দিছে। ওই আমারে ধইরা নিয়া আলবদর ক্যাম্পের পাহারাদার বানাইছে। আমি ওর শেষ দেকপার চাই। কামরুজ্জামানের ফাঁসি দেইক্কা মরবার চাই।’

রিভিউ আপিল আবেদন খারিজ হওয়ায় ফাঁসির রায় বহাল থাকার সংবাদে এভাবেই নিজের প্রতিক্রিয়া জানালেন আলবদর কমান্ডার কামারুজ্জামানের এক সময়ের সহচর শেরপুরের আত্মস্বীকৃত আলবদর মোহন মিয়া ওরফে মহন মুন্সী।

একাত্তরে মহন মুন্সী ছিলেন শহরের নয়আনি বাজার আলবদর টর্চার ক্যাম্পের পাহারাদার।

তিনি বলেন, সুরেনসার (ব্যবসায়ী সুরেন্দ্র মোহন সাহা) বাসায় কতো মাইনসেরে যে ধইরা নিয়া নির্যাতন করা হইছে আমি তার সাক্ষী। আমার চক্কের সামনে সব ঘটছে। কামরুজ্জামানের নির্দেশে ধইরা আইন্না নির্যাতনের পর অনেককে হত্যা করা হয়েছে। সময় সময় কামরুজ্জামান আইসা অর্ডার দিতো, কখনো খারাই থাইক্কা মারাইতো। আর দোতলায় চলতো মওজ-স্ফুর্তি।

খরখড়িয়ার গোলাম মোস্তফারে কামরুজ্জামানেই মারাইছে।

শহরের বাগরাকসা এলাকার বাসিন্দা আলবদর মহন মুন্সী কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। নানা অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত মহন মুন্সী আক্ষেপ করে বলেন, কামরুজ্জামান আমার জীবনডারে শেষ করা দিছে। মাইনষে দেকলে আমারে ‘বদর’ কইয়া, ‘রেজাকার’ কইয়া গাইল (গালি) দেয়।

তিনি বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য মুজাহিদ ট্রেনিং দিয়েছিলাম, কিন্তু ওই (কামরুজ্জামান) আমারে জোর কইরা ধইরা বদর বানাইছে। বদর ক্যাম্পের পাহারাদার করছে। জীবনের ভয়ে তখন কিছুই কবার পাই নাই। যহন সুযোগ অইছে, তখন ওর বিচার দাবি করছি।

মহন মুন্সী বলেন, সাক্ষী দেওয়ার পর কামরুজ্জামানের লোকজন আমারে নানা ভয়ভীতি দেহায়া চলছে। আমারে পাইলে ওরা শেষ কইরা দিবো, ইমুন হুমকিও দেয়। নানা জনের কাছে নানা কথা কয়। কিন্তু, আল্লায় আছে। যা সত্য তাই কইছি।

তিনি বলেন, কামরুজ্জামান আমার জীবন শেষ করছে, আমি ওর জীবনের শেষ দেকপার চাই। আল্লার কাছে কই, ওর ফাঁসিডা না দেইক্কা যেন আমার মরণ না দেয়।

এদিকে, ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর কামারুজ্জামানের লাশ শেরপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবেনা বলে ঘোষণা দিয়েছেন কামারুজ্জামানের সম্বন্ধী (স্ত্রী বড় ভাই) জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার নূরুল ইসলাম হিরু।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড কার্যালয়ে আদেশ পরবর্তী এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, শেরপুরের মাটিকে সে কলঙ্কিত করেছে। তার মতো কুলাঙ্গারের স্থান শেরপুরের মাটিতে হবেনা।

এ ব্যাপারে প্রশাসন, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বলেছি। আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি, কামারুজ্জামানের লাশ শেরপুরের মাটিতে দাফন প্রতিহত করতে প্রয়োজনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে হরতাল-অবরোধসহ আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

কামারুজ্জামানের মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আরেক সাক্ষী বীর প্রতীক বার জহুরুল হক মুন্সী বলেছেন, ট্রাইব্যুনালের কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় আপিল বিভাগেও বহাল ছিল। এবার রিভিউ আপিল খারিজ হওয়ায় এতদিনে আমাদের বুকের কষ্ট কিছুটা লাঘব হলো। এখন কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকর দেখে মরতে চাই।

তিনি বলেন, আমি পাকবাহিনীর জামালপুর পিটিআই ক্যাম্পে সারেন্ডার পত্র নিয়ে গেলে সেখানে কামারুজ্জামানকে উপস্থিত দেখতে পাই। সেখানে তার নির্দেশে আমাকে রশিতে বেঁধে পা উপরের দিকে ঝুঁলিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছিলো।

কামারুজ্জামানের নির্যাতনের শিকার শহরের চকবাজার এলাকার মজিবর রহমান পানু বলেন, কামারুজ্জামানের নির্দেশে আমাকে শেরপুর থেকে ধরে ঝিনাইগাতীর আহমদনগর পাক বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে গুলির অর্ডার দেওয়া হয়। সেসময় সেখানে কামারুজ্জামান উপস্থিত ছিল। কিন্তু আল্লার অশেষ রহমতে আমি বেঁচে যাই। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সেইদিনের সেই বিভীষিকার কথা মনে হলে আজও সমস্ত শরীর শিউরে ওঠে। আমি ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যও দিয়েছি। আজ রিভিউয়ে তার ফাঁসির রায় বহাল থাকায় আমি খুশি।

মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট প্রদীপ দে কৃষ্ণ বলেন, রিভিও আবেদন খারিজের মধ্য দিয়ে শেরপুর আজ কলঙ্কমুক্ত হলো। আমরা সন্তুষ্ট, সত্যের জয় চিরকালীণ।

সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম শেরপুর জেলা শাখার সভাপতি মো. আমজাদ হোসেন বলেন, বারবার ফাঁসিই তার জন্য উপযুক্ত সাজা। রিভিউ খারিজ হওয়ায় সেটাই আবারো প্রমাণ হলো।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির সদস্য সচিব মো. হারেজ আলী বলেন, সত্য কখনো চাপা থাকেনা। কেউ কেউ বলেন, কামারুজ্জামান নয়, আরেক আলবদর কামরান এখানে সব অপকর্ম করেছে। আজ রিভিউ আপিল আবেদন খারিজের মধ্য দিয়ে প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কামারুজ্জামান ছিলেন বদর সংগঠক, ছাত্রসংঘের লিডার, আর কামরান ছিলো কামারুজ্জামানের অপারেশনাল কমান্ডার। আমরা দ্রুত তার ফাঁসি কার্যকর দেখতে চাই।

শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ছানুয়ার হোসেন ছানু, পৌর মেয়র হুমায়ুন কবীর রুমান কামারুজ্জামানের রিভিও আবেদন খারিজ হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

এমএএস/আরআই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।