প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ৫ মিনিট কথা বলতে চান জিন্নত আলী


প্রকাশিত: ১২:৫০ পিএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মাত্র ৫ মিনিট কথা বলতে চান সিরাজগঞ্জে প্রথম স্থাপিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী বর্তমানে রিকশাচালক জিন্নত আলী। গত ৪৪ বছর ধরে তিনি স্থানীয় রাজনীতিবিদদের কাছে ধর্ণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেননি। জিন্নত আলীর শেষ ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা।

সিরাজগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী ইলিয়ট ব্রিজের পূর্বপাশেই সিরাজগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। কালের বিবর্তন, চরম অবহেলা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে ইতিহাস সমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় এ শহীদ মিনারটি। শহীদ মিনারটি নির্মাণের সময় প্রথম যে শিশুটি ইট পুতেছিলেন সেই জিন্নত আলী এখন রিকশা চালিয়ে জীবন অতিবাহিত করছেন।

আর শহীদ মিনারের উভয়পার্শ্বে সিনেমা, দোকানপাট এবং তৎসংলগ্ন স্থানে কাঁচা বাজার বসার কারণে ঢাকা পড়ছে মিনারটি। কেউ আবার দখল করে নিয়েছেন জায়গাটির অনেকাংশ। সিরাজগঞ্জ পৌর কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার কারণেই এমনটি হচ্ছে বলে শহরবাসী মনে করছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ ইলিয়ট ব্রিজ এলাকায় অবিস্থত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন সিরাজগঞ্জ রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা ও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ বোচার ছেলে জিন্নত আলী। তখন জিন্নতের বয়স ছিল মাত্র সাড়ে ৫ বছর। এখন সেই জিন্নত আলী ৭০ বছরের বৃদ্ধ।

শহরের গয়লা গ্রামে তার নিজ বাড়িতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সম্পর্কে জানতে চাইলে জিন্নত আলী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, কি হবে ওই সব লিখে। অনেকক্ষণ চিন্তা করেন জিন্নত আলী। তারপরও বলেন আমি তখন ছোট। বাবা নূর মোহাম্মদ বোচা ছিলেন সিরাজগঞ্জ রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা। আর ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন ওই ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক।

১৯৫২ সালের মার্চ মাস সিরাজগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল উত্তপ্ত। আওয়ামী লীগ ও মুসলিম লীগের ভিত্তি ছিল শক্ত। মুসলিম লীগ ও সরকারের কড়া নজরদারীর কারণে শহীদ মিনার নির্মাণ ছিল কঠিন কাজ। কিন্তু সে সময়ের শ্রমিক নেতৃবৃন্দরাও ছিল নাছোড়বান্দা।
তাদের কথা ছিল শহীদ মিনার তারা গড়বেই।

১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির আগের রাতে শ্রমিকরা বিভিন্ন স্থান থেকে ইট, বালি, সিমেন্ট এনে ইলিয়ট ব্রিজের পূর্বপার্শ্বে রাখে। শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য শ্রমিকরা ছাত্র, শিক্ষক ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে এক জরুরী বৈঠক করে। ওই বৈঠকেই সকলে শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। কিন্তু কে ভিত্তি করবে। কে আগে ইট পূঁতবে সে বিষয়টি নিশ্চিত না হওয়াতে সকলের মধ্যে অনৈক্য দেখা দেয়।

পরে সকলের সর্বসম্মতিক্রমে বাবা (তৎকালীন রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ বোচা) আমাকে দিয়ে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে ভিত্তিপ্রস্তরের ইট রাখেন।
 
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকসেনা ও রাজাকাররা সেই অসমাপ্ত শহীদ মিনার ভেঙে দেয়। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালে পুনরায় সেই শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সেটি হয় পূর্বেরটি থেকে প্রায় ১শ গজ দূরে। বর্তমানে সিরাজগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হিসেবে পরিচিত।

১৯৮৮ সালে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার মাধ্যমে পুনঃসংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই থেকে এটি আজ পর্যন্ত পৌরসভা পরিচালনা করে আসছে।

ওই সময় কে কে উপস্থিত ছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে জিন্নত আলী বলেন, আমি অনেক ছোট ছিলাম তাই তখন ওসব বুঝি নাই। কিন্তু পরে জানার চেষ্টা করেছি উপস্থিত থাকা ব্যক্তিরা ছিলেন প্রয়াত সাংসদ মির্জা মোরাদুজ্জামান, আবুল হোসেন (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার নৈশ-প্রহরী) বিড়ি শ্রমিক নেতা জসিম উদ্দিন, কান্টু বসাকসহ অনেকেই। এছাড়া অনেকের নাম মনে রাখা সম্ভব হয়নি। আবার অনেকে বেঁচেও নেই।

Sirajgonj

১৯৫২ সালের ভাষার জন্য সংগ্রাম, দেশের পরিস্থিতি এবং ১৯৫৩ সালে সিরাজগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনার স্থাপনের স্মৃতিচারণ করতেই কেঁদে ফেলেন জিন্নত আলী।

৭০ বছর বয়স্ক জিন্নত আলীর ক্ষোভ সরকারি-বেসরকারিভাবে কোনোদিন রাষ্ট্রীয় দিবসে তাকে কোথাও ডাকা হয়নি। নতুন প্রজন্মকে রাষ্ট্র ভাষার জন্য সিরাজগঞ্জের মানুষের অবদান শহীদ মিনার তৈরির ইতিহাস জানানোর জন্য কেউ তাকে মনে করেনি। তার মতে দেশের সকল জেলাগুলোর মধ্যে সিরাজগঞ্জের শহীদ মিনার নির্মাণের ইতিহাস ব্যতিক্রম। কিন্তু সে ইতিহাস থেকে যাচ্ছে পর্দার অন্তরালে। জীর্ণ কুটিরে বসবাস করা ৫ কন্যা ও ১ সন্তানের জনক জিন্নত আলী বয়সের ভারে নূজ্য হলেও অভাবের তাড়নায় তাকে এখনও ধরতে হচ্ছে রিকশার হাতল।

৩ মেয়েকে ইতোমধ্যে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। আরো ২ মেয়েকে বিয়ে দিতে তিনি এখন ব্যস্ত। তাইতো রোগ-শোকে কাতর জিন্নত আলীকে প্রতিনিয়ত ভাড়ার জন্য ডাক ছাড়তে হচ্ছে স্যার-আপা কোথায় যাবেন?

শেষ জীবনে কি আশা করেন, এমন প্রশ্নে জবাবে জিন্নত আলী বলেন, স্বাধীনতার ৪৪ বছরে যারাই রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেছে আমি সেই সকল রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছে আবেদন করেছি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ৫ মিনিট কথা বলার জন্য। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেই আমার সাক্ষাৎ জোটেনি। তাই আমার শেষ ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি কথা বলা।

নতুন প্রজন্মের কাছে আপনার উপদেশ কি এমন প্রশ্নের জবাবে জিন্নত আলী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস যেমন জানতে হবে তেমনি রাষ্ট্র ভাষা অর্জনের ইতিহাসও জানতে হবে। নতুবা একদিন সকল ইতিহাস হারিয়ে যাবে চিরতরে।  

এমএএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।