২০ লাখ টাকা নিয়ে ফেল করা ব্যক্তিকে অধ্যক্ষ নিয়োগ


প্রকাশিত: ০৩:৩১ পিএম, ০৪ মার্চ ২০১৭

কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার শাহবাজার এ এইচ ফাজিল মাদরাসায় অধ্যক্ষ নিয়োগ পরীক্ষায় ফেল করা প্রার্থী আরবি প্রভাষক মো. নজরুল ইসলামকে নিয়োগ দেয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছে মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদ।

এ নিয়ে ২০ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। এ উৎকোচের প্রায় ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেনের ব্যাংক হিসাবে। নিয়োগ বাণিজ্য নির্বিঘ্ন করতে পরীক্ষার আয়োজন করা হয় রংপুর ধাপ সাতগারা কামিল মাদরাসায়।

এসব কিছুর কলকাঠি নারেন মাদরাসা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান প্রামাণিক। কিন্তু এ যাত্রায় বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসা বোর্ড প্রতিনিধির আপত্তির কারণে ব্যর্থ হয়ে এখন গোপনে ঢাকায় পরীক্ষা নেয়ার নতুন মিশন চলছে। এ খবর ফাঁস হওয়ায় ঘটনাটি এখন ফুলবাড়িতে টক অব দ্যা টাউন।

অভিযোগ থেকে জানা যায়, শাহবাজার এ এইচ ফাজিল মাদরাসায় অধ্যক্ষ মাওলানা ফজলুল করিম অবসরে গেলে অধ্যক্ষ পদটি ফাঁকা হয়ে যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মানুযায়ী উপাধ্যক্ষ অধ্যক্ষের দায়িত্ব পাওয়ার কথা থাকলেও নিয়ম ভেঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ রসায়ন বিভাগের প্রভাষক আলমগীর হোসেনকে অধ্যক্ষের দায়িত্ব প্রদান করে।

এরই মধ্যে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় দৈনিক ও একটি স্থানীয় পত্রিকায় অধ্যক্ষ ও দুইজন এল.এম এস.এস পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সে অনুযায়ী অধ্যক্ষ পদে ৭ জন প্রার্থী আবেদন করেন।

নিয়োগ বাণিজ্য নিরাপদ করতে ২০ জানুয়ারি রংপুর ধাপ সাতগারা কামিল মাদরাসায় নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সাজানো পরীক্ষা হওয়ায় উপাধ্যক্ষ মো. আবুল কাশেম ও মো. মিনহাজুল ইসলাম নামের দুইজন প্রার্থী উপস্থিত হয়নি। নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রার্থী আরবি প্রভাষক মো. নজরুল ইসলামকে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হাবিবুর রহমান প্রামাণিক ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেনের পছন্দের প্রার্থী হওয়ায় তাকে নিয়োগের তোড়ে জাড় চালায়।

অথচ লিখিত পরীক্ষায় ওই প্রার্থী পেয়েছে মাত্র ৫ নম্বর। ফেল করা প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য চাপ দেয়া হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি স্ট্যাডিস বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মাহবুবুর রহমান ও মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতরের সহকারী পরিচালক ড. মো. আব্দুল মান্নান মোল্লাকে।

কিন্তু তারা অনৈতিক আবদার অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র দুইজন এলএমএসএস’র নিয়োগের সুপারিশ করে অধ্যক্ষ পদের পুনঃবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন। এরই মধ্যে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হাবিবর রহমান প্রামাণিক ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন অর্থের বিনিময়ে আরবি প্রভাষক নজরুল ইসলামকে আবার নতুন করে নিয়োগ দেয়ার জন্য অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছেন।

এরই মধ্যে তারা আরবি প্রভাষক নজরুল ইসলামকে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দেয়ার শর্তে ২০ লাখ টাকা লেনদেন করেছেন। উৎকোচের প্রায় ১০ লাখ টাকা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেনের স্যালারি একাউন্ট নং-৩৪১৯৩৮৭৭, সোনালী ব্যাংক লি. ফুলবাড়ী, কুড়িগ্রাম এর মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে। এ জন্য পুনঃনিয়োগ বিজ্ঞপ্তি গোপন করা হয়।

অপরদিকে, এম.এল.এস.এস. নিয়োগের জন্য দুইজন প্রার্থীর কাছ থেকে সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ৪ লাখ টাকা নিয়েছেন। এছাড়া সভাপতির বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের একজন সহকারী মৌলভিকে অন্যায়ভাবে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দিয়ে পঞ্চাশ হাজার টাকা নেন।

বিজ্ঞান কারখানার যন্ত্রাংশ ক্রয় করার জন্য সরকার কর্তৃক বরাদ্দের টাকা হতে ক্রয় কমিটির কাছ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা কমিশন নেন। প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হওয়ায় তিনি বিভিন্ন শিক্ষক ও কর্মচারীর কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে পারিশোধ না করার একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি স্টাডিস বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মাহবুবুর রহমান ফেল করা প্রার্থীকে নিয়োগে কমিটির চাপের কথা স্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, লেনদেনের অভিযোগ শুনেছি। মূলত নিয়োগ বাণিজ্য করতেই পরীক্ষা রংপুরে নেয়া হয়। ৩০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় ৫ জন প্রার্থীর কেউ পাশ করেনি। সর্বনিম্ন ২ এবং সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ নম্বর পেয়েছে। এরকম অযোগ্যদের নিয়োগ দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। শুনেছি আবারও পুনঃনিয়োগ বিজ্ঞপ্তি গোপন করা হয়েছে পছন্দের প্রার্থীকে নেয়ার জন্য। এছাড়া প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পরীক্ষার আয়োজন না করে অন্যত্র নেয়ার চেষ্টা করছেন।  

এ বিষয়ে মাদরাসার পরিচালনা পর্ষদের হাবিবুর রহমান প্রামাণিক বলেন, নিয়োগ মানে টাকার খরচ। বোর্ড থেকে শুরু করে সাংবাদিক, কমিটির সদস্য সবাইকে ম্যানেজ করতে হয়। এছাড়া মাদরাসায় অনেক খরচ হয়। তিনি এমএলএসএস নিয়োগে জনপ্রতি এক লাখ টাকা নেয়ার কথা স্বীকার করেন।

আরবি প্রভাষক মো. নজরুল ইসলামকে অধ্যক্ষ নিয়োগের পক্ষে মত প্রকাশ করে বলেন, তিনি অসুস্থ থাকায় ওই পরীক্ষায় ভালো করতে পারেননি। তবে আগামী নিয়োগ পরীক্ষায় তিনি ভালো করবে আমার বিশ্বাস।

এবার পরীক্ষা ঢাকায় নেয়া হবে এমন অভিযোগের জবাবে বলেন, এখনো নিশ্চিত না। বোর্ডের প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে ঠিক করা হবে।

তিনি জোর গলায় বলেন, প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে কিছু অনিয়ম করতে হয়। এতে কিছু করার নেই। সব বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান এভাবেই চলে। নজরুল ইসলাম ওই দিনই টাকা (২০ লাখ) দিলে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ সম্পন্ন করা যেত।

এ নিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রভাষক আলমগীর হোসেন বলেন, কিছু লেনদেন হয়েছে। তবে বিষয়টি কমিটির সভাপতি ভালো জানেন। তার বেতন বিলের হিসাব নম্বরে ১০ লাখ টাকার লেনদেনের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এই টাকা আমার ব্যক্তিগত। কিন্তু তিনি তার আয়ের বৈধ উৎস জানাতে পারেননি।

নাজমুল হোসেন/এএম/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।