অপরাধের সীমান্ত এখন ‘আলোকিত সীমান্ত’


প্রকাশিত: ১১:০৬ এএম, ২০ এপ্রিল ২০১৫

এক সময় গ্রামটিতে প্রতিদিন কেউ না কেউ আটক হতো সীমান্তের ওপারে গরু আনতে গিয়ে। মাদক চোরাচালান ছিল গ্রামের মানুষগুলোর প্রধান আয়ের পথ। ভারতে গিয়ে বিএসএফের হাতে কারো না কারো আটক হওয়ার ঘটনা ছিল স্বাভাবিক চিত্র।

জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার আমগাঁও ইউনিয়নের ‘শুঁটকি বস্তি’ গ্রামের মানুষেরা আজ অন্যরকম। চোরাকারবারী থেকে চোরাচালান প্রতিরোধকারী হওয়ার দিকে দৃঢ় পদক্ষেপে এগোচ্ছে তারা।

উপজেলার রত্নাই সীমান্তে ৩০ বিজিবির ‘আলোকিত সীমান্ত’ কর্মসূচি বদলে দিয়েছে গ্রামের মানুষগুলোকে। নিজেদের শ্রম ও ঘামে তারা গড়েছে গরুর খামার, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট, জৈব সার, মাশরুম চাষ, মধু চাষ, ফল ও ঔষধি গাছ উৎপাদন করছে।

স্বাভাবিক জীবিকার জন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সামগ্রিক পরিবেশ ও নৈতিকতার অবক্ষয় এ এলাকার সাধারণ মানুষকে সীমান্তে অপরাধের দিকে ঠেলে দেয়। এ অবস্থায় বিজিবির ঠাকুরগাঁও সেক্টরের অধীনে শুরু হয় ‘আলোকিত সীমান্তের’ ৬টি প্রকল্প।

সোমবার বিজিবির মহাপরিচালকের পক্ষে প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন বিজিবি উত্তর-পশ্চিম রিজিওনের রিজিওন কমান্ডার (রংপুর) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহফুজুর রহমান।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন, ঠাকুরগাঁও সেক্টর কমান্ডার একরামুল হক, জেলা প্রশাসক মূকেশ চন্দ্র বিশ্বাস, জেলা পুলিশ সুপার আব্দুর রহিম শাহ চৌধুরী, ৩০ বিজিবির পরিচালক তুষার বিন ইউনুস, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা চেয়ারম্যান সফিকুল ইসলাম, আমজানখোর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ আইয়ুব আলী প্রমুখ।

উল্লেখ্য, সীমান্তের ওই গ্রামের মোট ৩৫টি পরিবারের মধ্যে ২৩টি পরিবার এই সমবায় উৎপাদনযজ্ঞে অংশ নিয়ে নিজেদের বদলাচ্ছে। প্রকল্পগুলো সফল করতে সম্পূরক কাজ হিসেবে ইপিল ইপিল ঘাস চাষ, শিশুপার্ক স্থাপন, টিউবওয়েল স্থাপন, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসকের সক্রিয় ভূমিকায় ভূমিহীনদের মধ্যে খাস জমি বরাদ্দ ও বিতরণ, বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন, এলজিইডির মাধ্যমে কাঁচা রাস্তা পাকাকরণের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। চলছে বাণিজ্যিকভাবে তুলনামূলক বিশুদ্ধ ও যথাসম্ভব রাসায়নিক মুক্ত সবজি চাষের প্রস্তুতি।

এই অপরাধপ্রবণ এলাকায় মানুষকে নতুনভাবে বাঁচতে শেখার যিনি স্বপ্ন দেখান তিনি হলেন ৩০ বিজিবির অধিনায়ক লে.কর্নেল তুষার ইউনূস। এ প্রসঙ্গে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, গত বছরের ১৯ নভেম্বর বিকেলে এই গ্রামের শাহ আলম নামে এক যুবক ভারতে গরু আনতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে মারা যায়। এ ঘটনা আমাকে ভাবায়। সীমান্তে পাহারা আমরা যথেষ্ট জোরদার করেছি। প্রতিদিনই এখানে অপরাধে যুক্ত মানুষদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তারপরও কি যেন একটা বাদ পড়ে যাচ্ছে। মনে হলো, প্রত্যন্ত ও অনুন্নত এলাকায় মানুষ যাতে সৎভাবে কাজ করে জীবন ধারণ করতে পারে সে উপায়টিও তো তাকে দেয়া দরকার।

প্রকল্পের অন্যতম সদস্য রানী বেগম বলেন, আমরা একা একা ঘরে অনেক আলোচনা আর লড়াই করতাম যাতে আমাদের স্বামীরা সীমান্তের ওপারে না যায়। তখন জোর ছিল না, আজ জোর পাচ্ছি। কেন আমরা বাঁচার পথ থাকতে মরতে যাবো?

বিএসএফের হাতে নিহত শাহ আলমের বাবা প্রকল্পের অন্যতম অনুপ্রেরণা দায়ক গ্রামের মুরুব্বি শের আলী বলেন, আমার ছেলের মতো আর কাউকে যেন চোরকারবারী করতে গিয়ে মরতে না হয়।

এমএএস/আরআই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।