রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি : দাদি-নানীর কোলই এখন ওদের ভরসা
সাড়ে চার বছরের সিয়াম। বাবা-মার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। ঘর ও আশপাশ ঘুরে দেখে। কিন্তু, বাবা-মাকে খুঁজে পায় না। হঠাৎ হঠাৎই নানীকে জিজ্ঞেস করে, বাবা-মা কোথায় নানী? নাতির প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না নানী। অবুঝ সন্তানের এ রকম অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নানী আনোয়ারা বেগম।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধসে নিহত হয় মেয়ে রোকসানা আক্তার রনি ও জামাতা ইমরান হোসেন। রেখে যায় আড়াই বছরের সিয়ামকে। এই দুর্ঘটনায় শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌর শহরের চকপাড়া মহল্লার রোকসানা-ইমরান ছাড়াও নয় মাসের শিশু পুত্র রনিকে রেখে বাবা সেলিম রানা ও মা রহিমা বেগম নিহত হয়। এছাড়া ওই এলাকার চার বছরের ছন্দাকে রেখে বাবা হালিম নিহত হয়। দাদি- নানীর কোলই এখন ওদের ভরসা।
সিয়ামের নানী আনোয়ারা বেগম জানান, নাতির নামে বিদেশিরা একটি ১০ লাখ টাকার ও র্যাব থেকে আড়াই লাখ টাকার একটি ফিক্সড ডিপোজিট করে দিয়েছে। আর সে টাকার নমিনি হয়েছে সিয়ামের এক চাচাতো ভাই। দু’বছর পার হয়ে গেলেও তার কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা পাওয়া যায়নি।
এদিকে সর্বস্ব হারিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণ তহবিল ও ট্রাস্ট ফান্ড থেকে মেয়ের নামে যে এক লাখ টাকা অনুদান পেয়েছি সে টাকা দিয়ে স্বামী আব্দুর রশীদ একটি ইজিবাইক কিনেছেন। সারাদিন চালিয়ে যে আয় হয়, তা দিয়েই নাতি ও ছেলে রাসেলকে নিয়ে চলছে তাদের সংসার। কিন্তু, কিছু দিন আগে ছেলে লেদ মেশিনে দুর্ঘটনায় বা হাতের কব্জি হারিয়ে পঙ্গু হয়ে আছে।
আনোয়ারা বলেন, আড়াই বছরের নাতিটি এবার সাড়ে চার বছরে পা দিয়েছে। সারাক্ষণ আপন মনে ঘুরে বেড়ায়। ক্ষণে ক্ষণে প্রশ্ন করে ওর বাবা-মা কখন আসবে? আবার কখনও কখনও চলে যায় ওর বাবা-মায়ের কবরের কাছে। সে কবরের বুকে ফুটে উঠা ফুল তুলে এনে নানীকে দিয়ে বলে, বাবার বুকে ফুল ফুটেছে। নাতির এসব কাণ্ডে নানী শুধু আঁচলে চোখ মোছেন।
সিমায়ের মতো বাবা হালিমকে হারানোর পর মা হেলেনার কোলে বেড়ে উঠছিল ছন্দা। কিন্তু, সে সুখও তার কপালে টেকেনি। এক বছর যেতে না যেতেই প্রধানমন্ত্রীর কল্যাণ তহবিল থেকে যে টাকা পেয়েছিল, সেটা নিয়ে মা হেলেনা দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে চলে যায়। ছন্দার আশ্রয় হয় দাদা-দাদির কোল।
এদিকে মা হেলেনা মেয়ে ছন্দার কোনো খোঁজ না নিলেও, প্রধানমন্ত্রীর মঞ্জুরিকৃত টাকা থেকে বঞ্চিত হবেন এই ভয়ে সে ছন্দাকে ফিরিয়ে নিতে শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর ও ১০ বছরের ননদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছে।
ছন্দার দাদা হারেজ আলী বলেন, ছেলে নাই, ছেলের টাকার প্রতি আমাদের লোভও নাই। তাই যে টাকা পাওয়া যাবে, সব টাকাই যেন নাতি ছন্দা পায় সে ব্যবস্থা করার জন্যই আমি দাবি জানাই।
রনি অবশ্য এসব বিতর্কের ঊর্ধে উঠে চলে গেছে না ফেরার দেশে। সাভার ট্রাজেডিতে ছেলে সেলিম রানা, পুত্রবধূ রহিমা বেগম ও মেয়ে মুনিরাকে হারিয়ে মন্নাফ মিয়া নয় মাসের রনিকে পেয়ে ছেলে- মেয়ে হারানোর দুঃখ ভুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, গত বছর আকস্মিকভাবে ডায়রিয়ার আক্রান্ত হয়ে রনি মারা যায়।
সাভারের রানা প্লাজা ট্রাজেডিতে এ উপজেলার আরও নিহত হয়েছেন হাবিবুর রহমানের ছেলে সেকান্দর, সেন্টু, পিঠাপুনি গ্রামের সুরুজ আলীর ছেলে কাউসার। আর মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে সেই বিভীষিকা নিয়ে বেঁচে আছেন মৃত আব্দুল আজিজের ছেলে আব্দুল মজিদ, মজিদের ছেলে খোরশেদ আলম, ফারুক আহমেদ, আক্তার হোসেনের ছেলে মাসুদ রানা, মকবুল হোসেনের ছেলে ফিরোজ, গেরাপচা গ্রামের রাজা মিয়ার ছেলে নাজমুল, আব্দুল মন্নাফের মেয়ে মানসুরা মুন্নী ও কুতুব আলীর ছেলে মফিজুল।
তারা জানান, এখনও চোখের সামনে ভেসে উঠে সেইদিনের ভয়াবহতা। বিকট শব্দ, চিৎকার। শুধু লাশ আর লাশ। তারা বলেন, সেদিনের কথা মনে হলে, এখনও আমরা ঘুমাতে পারি না। তাদের দাবি, বাবা-মা হারা যে সমস্ত শিশু সন্তান রয়েছে তাদের যেন সরকার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে।
এসএস/এমএএস/আরআইপি