ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত মৃৎশিল্পীরা


প্রকাশিত: ০৪:২৯ এএম, ০৯ এপ্রিল ২০১৭

আসছে বাংলা নববর্ষ ১৪২৪। বাঙালির আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনে বাংলা নববর্ষের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। নববর্ষ আমাদের জীবনে আসে নতুন স্বপ্ন নিয়ে, বেঁচে থাকার নবীন আশ্বাস নিয়ে। বাঙালির নববর্ষকে ঘিরে রয়েছে নানা ঐহিত্য আয়োজন। যার মধ্যে মৃৎশিল্প অন্যতম।

ঠাকুরগাঁওয়ে নববর্ষের দিন রাস্তার পাশে খোলা মাঠে ও বিভিন্ন জায়গায় আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলা। আর সেই মেলায় থাকে নানা রকম কুটির শিল্প ও মৃৎশিল্পের সামগ্রী। তবে এটি বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তির পথে। কালের আবর্তে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে দেশের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচাঁ ইউনিয়ের একটি গ্রাম পালপাড়া। এখানকার মানুষ চার পুরুষ ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত।

কাজ করছিলেন বাড়ির কর্তা মহেষ পাল। কথা বলে জানা যায়, তারা চার পুরুষ এই মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত। তবে দিন দিন এই শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বলে শঙ্কায় তিনি। অপরদিকে নতুন প্রজন্ম এসব কাজ করতে আগ্রহী না। তাই অন্য পেশায় জীবিকা নির্বাহ করছে।

kumar

শ্রীমতি রানী জানান, তার পূর্ব পুরুষরা মৃৎশিল্পের কাজ করতো। বিয়েও হয়েছে একই বংশে। তাই পুরুষদের পাশাপাশি তিনিও এই কাজ শিখেছেন। এ কাজে পরিষ্কার এঁটেল মাটির প্রয়োজন। কারণ এধরনের মাটি বেশ আঠালো। তবে ঠিকমতো মেলে না এ মাটি। এছাড়া শত কষ্টের পর পণ্য যেন বিক্রি করাই দায়।

তবুও পূর্ব পুরুষের ঐহিত্য ধরে রাখার জন্য বৈশাখ মাস উপলক্ষে ঠাকুরগাঁওয়ের মৃৎশিল্পীরা মাটির নানা রকম আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সংরঞ্জাম তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

মৃৎশিল্পের কষ্টের কথা বললেন ঝর্ণা রানী। তিনি বলেন, কত কষ্ট করে আমরা বিভিন্ন জিনিস তৈরি করি। কিন্তু বাজারে বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্যের কারণে এসব জিনিসের দাম পাই না। বৈশাখ মাস আসলেই এখন মেলায় বিক্রি করার জন্য এসব তৈরি করি। আর বছরের ১১ মাস খেত-খামারে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি।

kumar

পালপাড়া এলাকার সুজন বর্মন জানান, মাটির তৈরি জিনিস বিক্রি করে সংসার চলে না। তাই অন্য পেশায় কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। সরকার বিভিন্ন পেশায় সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে কিন্তু মৃৎশিল্পীদের কোনো সরকারি সুবিধা দেয়নি।

ঠাকুরগাঁও প্রবীণ ব্যক্তিত্ব বলরাম গুহ ঠাকুর বলেন, নববর্ষ কেবল সাংস্কৃতিক আর সামাজিক উৎসবই নয়, একই সঙ্গে তা অর্থনৈতিক উৎসবও বটে। বাংলার নববর্ষ আমাদের অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে নিবিড় ও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাংলা নববর্ষের অতীত ঐতিহ্যগুলো যদি যথাযথভাবে পুনর্জীবিত করা যেত, তাহলে নিঃসন্দেহে আমাদের অর্থনৈতিক বিপন্নতা-উত্তরণের একটা পথ পাওয়া যেত। বাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য মৃৎশিল্পসহ সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করার আহ্বান জানান তিনি।

ঠাকুরগাঁওয়ের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মনতোষ কুমার দে জানান, বাঙালি জাতির নববর্ষের ঐহিত্য সেই আগের মত নেই। নববর্ষের সঙ্গে অন্য যে প্রসঙ্গটি নিবিড়ভাবে জড়িত, তা হলো বৈশাখী মেলা। নববর্ষে বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসে মেলা।

kumar

বৈশাখ মাসজুড়ে চলে এই মেলা। কোথাও বা তিনদিন বা সাতদিনের মেলাও বসে। এসব মেলায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি হয়, বিক্রি হয় মাটির তৈরি নানা ধরনের খেলনা। এসব মেলায় যাত্রা, পুতুল নাচ ও সার্কাস বসে, গ্রামীণ জীবনে দেখা দেয় নতুন উৎসাহ-উদ্দীপনা। সন্দেহ নেই, এই মেলায় কেনাবেচার প্রক্রিয়া বাংলার গ্রামীণ অর্থনৈতিক জীবনে নতুন প্রবাহ সঞ্চার করে।

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল জানান, বাংলা নববর্ষে আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো এখন একটা প্রথায় পরিণত হয়েছে। ফলে নানা ধরনের খাবার কেনা হয়, কেনা হয় নানা মিষ্টিদ্রব্য। এই মিষ্টিদ্রব্য নববর্ষের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবেই বিবেচ্য। ঠাকুরগাঁওয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করতে আমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। বাংলা ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য সরকার মৃৎ শিল্পসহ নববর্ষের সংস্কৃতি রক্ষার্থে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

রবিউল এহসান রিপন/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।