সাঘাটায় মূল আসামির পরিবর্তে কারাভোগ করছেন অন্যজন


প্রকাশিত: ০৭:১৭ এএম, ১৭ এপ্রিল ২০১৭

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলায় একটি ধর্ষণ মামলায় মূল আসামির পরিবর্তে গত আটদিন ধরে কারাভোগ করছেন রিকশাচালক মোজাফফর রহমান। তিনি ওই উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নের নলছিয়া গ্রামের মৃত ছিদ্দিক বেপারীর ছেলে। আর মূল আসামি হচ্ছেন একই গ্রামের নজরুল ইসলাম। ঘটনাটি রোববার দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকদের নজরে আসে।

যমুনা নদী সংলগ্ন নলছিয়া গ্রামের দূরত্ব গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার। পাকা রাস্তা পেরিয়ে গ্রামের কাঁচা মেঠোপথ দিয়ে যেতে হয় মোজাফফর রহমানের বাড়িতে। নদী থেকে তার বাড়ির দূরত্ব মাত্র কয়েকশ গজ। সেই বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, মোজাফফরের মা, স্ত্রী ও ছেলেরা কান্নাকাটি করছেন। মোজাফফর রহমানের তিন ছেলে, স্ত্রী ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে ছয় সদস্যের সংসার। বড়ছেলে সেলিম মিয়া এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। দ্বিতীয় ছেলে সৈকত আহম্মেদ নবম এবং ছোট ছেলে শাহাদত প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।

মোজাফফরের স্ত্রী সেলিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার স্বামী ঢাকার মগবাজারে প্রায় ১০ বছর ধরে রিকশা চালায়। দুই-তিন মাস পরপর বাড়িতে আসেন। এসে কয়েকদিন থাকেন। তারপর আবার চলে যান। নজরুলের ভাই মজনু মিয়া ফুসলিয়ে তাকে আদালতে নিয়ে যায়। আমরা এর বিচার চাই।

এসময় মোজাফফরের বৃদ্ধা মা মজিদা বেগম বলেন, তোমরা হামার ছোলোক আনি দ্যাও। তার কোনো দোষ নাই।

কথা হয় মামলার বাদীর সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি নজরুল ইসলামকে একমাত্র আসামি করে মামলা করি। অথচ মজনু মিয়া মামলা থেকে ভাইকে বাঁচানোর জন্য মোজাফফরকে ফাঁসিয়েছে।

তবে সন্ধ্যায় আসামি নজরুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসী জানায়, নজরুলের নামে মামলার পর থেকে তার বাড়ির সবাই গাঢাকা দিয়েছে।

মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী আবু বকর সিদ্দিক জানান, মোজাফফরকে গত ১০ এপ্রিল নজরুল ইসলাম সাজিয়ে গাইবান্ধা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে আত্মসমর্পণ করানো হয়। এসময় তার জামিনের আবেদন করলে আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। পরদিন ১১ এপ্রিল পুনরায় একই আদালতে জামিনের আবেদন জানানো হলে আদালত তা নামঞ্জুর করেন। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

এদিকে রোববার দুপুর ২টার দিকে জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে মোজাফফর রহমানের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। মোজাফফর বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় রিকশা চালাই। ছেলের এইচএসসি পরীক্ষার কারণে গত ১ এপ্রিল বাড়িতে আসি।

এরপর গত ১০ এপ্রিল নজরুল ইসলামের বড়ভাই মজনু মিয়া আমাকে বলেন তোমার নামে মামলা হয়েছে। তোমাকে গাইবান্ধায় আদালতে যেতে হবে। শুনে আমি হতবাক হয়ে পড়ি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে গাইবান্ধা আদালতে আনে।

তিনি আমাকে শিখিয়ে দেন, মামলায় নজরুল ইসলাম লেখা আছে, পিতার নাম আছে মইচ উদ্দিন। তুমি আদালতে তোমার নাম নজরুল ও পিতার নাম মইচ উদ্দিন বলবে। তারপর আমাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আমি কোনো অপরাধ করিনি, আমার নামে কোনো মামলা আছে বলেও আমার জানা নেই। অথচ সেদিন (১০ এপ্রিল) থেকে আমি কারাগারে আছি।

মোজাফফর আরও বলেন, ভোটার আইডি কার্ডে আমার নাম মোজাফফর রহমান ও আমার পিতার নাম মৃত ছিদ্দিক বেপারী লেখা। আমার গ্রামের নাম নলছিয়া।

মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দুপুরে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার নলছিয়া গ্রামের আট বছরের এক শিশুকে একই গ্রামের মৃত মইচ উদ্দিন শেখের ছেলে নজরুল ইসলাম ধর্ষণের চেষ্টা করে। এই ঘটনায় ওই শিশুর মা ২০১৬ সালের ৩ জানুয়ারি সাঘাটা থানায় মামলা করতে যান। কিন্তু থানায় মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

পরে তিনি বাদী হয়ে ৬ জানুয়ারি গাইবান্ধা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলা করেন। আদালত সাঘাটা থানা পুলিশকে মামলা তদন্তের নির্দেশ দেন। সাঘাটা থানা পুলিশ ঘটনাটি মিথ্যা বলে ৮ ফেব্রুয়ারি আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে।

ওই বছরের ৩ মার্চ বাদী ওই প্রতিবেদনের উপর আদালতে নারাজির আবেদন করেন। পরে আদালত ঘটনাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। বিচারিক হাকিম সাক্ষী নিয়ে ঘটনার সত্যতা পেয়ে ২৯ মার্চ আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপর আদালত নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর থেকে আসামি নজরুল ইসলাম পলাতক ছিলেন।

এদিকে নজরুলের বড়ভাই মজনু মিয়া রোববার রাত ৮টায় মুঠোফোনে বলেন, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর থেকে আমার ভাই পলাতক ছিল। গত ৩০ মার্চ জামিন নেয়ার জন্য তাকে বাড়িতে ডেকে এনে অন্য গ্রামে রাখি। পরদিন দেখি সে নেই। পরে এক উকিল ও মহুরীর কথামত মোজাফফরকে সিএনজিতে করে গাইবান্ধা নিয়ে যাই। জোর করে নিয়ে যাইনি। তাকে বলি `আমার ভাই নেই, তুই আদালতে উঠবি আর নামবি। অথচ জামিন নামঞ্জুর হবে আমরা ভাবিনি।`

এ বিষয়ে গাইবান্ধা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) শফিকুল ইসলাম বলেন, ওইদিন (১০ এপ্রিল) ঘটনাটি আমাদের নজরে আসেনি। আইনজীবীদেরও সব আসামি চিনে রাখা সম্ভব হয় না। হয়তো কোনোভাবে এমনটা হয়ে যেতে পারে। তবে এমনটা হয়ে থাকলে বাদীর মাধ্যমে মূল আসামি চিহ্নিত করতে হবে। আসামি চিহ্নিত হলে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হবে।

এফএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।