হাতছানি দিয়ে ডাকছে স্বপ্নের মেরিন ড্রাইভ


প্রকাশিত: ১০:৫৬ এএম, ১৮ এপ্রিল ২০১৭

পথ চলতে চলতে সাগর, পাহাড় ও ঝর্ণাকে সঙ্গী করার স্বপ্ন আর দূরে নয়। সমুদ্রের কোলঘেঁষে নির্মিত নান্দনিক কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে এগোলেই পূরণ হবে স্বপ্ন।

একপাশে দাঁড়িয়ে আছে সবুজের সমারোহ নিয়ে উঁচু পাহাড়। অপরপাশে উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বালিয়াড়ির বুকে। এই দুইয়ের বুক চিরে চলে গেছে সু-প্রশস্ত পিচঢালা পথ।

পথের পাশে নানা প্রজাতির গুল্মলতা, ঝাউয়ের সারি মাতিয়ে তুলে মন। কল্পনার এই চিত্র বাস্তবে দেখা মিলে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের কোলঘেঁষে উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক।

কক্সবাজার জেলা শহরের কলাতলী থেকে সীমান্তবর্তী টেকনাফ উপজেলার সাবরাংয়ে প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সড়কটির নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ প্রকৌশল নির্মাণ ব্যাটালিয়ন (ইসিবি)। বর্তমানে নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ব পর্যটনের দুয়ার খুলতে চলছে সড়কটি। এটি পুরোদমে চালু হলে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যাওয়ার ক্ষেত্রে পর্যটকদের সময়ের অনেক সাশ্রয় হবে। তিন ঘণ্টার পথ পৌঁছানো যাবে মাত্র ঘণ্টা দেড়েকে।

কক্সবাজার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রানাপ্রিয় বড়ুয়া বলেন, তিন ধাপে সড়কটি নির্মাণ করছে সেনাবাহিনীর ১৬ ইসিবি। পুরো কাজ শেষ হলে সড়কটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী মে মাসের শুরুতে (সম্ভাব্য ২ মে) সড়কটি উদ্বোধন করবেন বলে আশা করছি।

সওজ বিভাগের কক্সবাজার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে তৎকালীন সরকারের আমলে ৪৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। তখন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২০৩ কোটি ২১ লাখ টাকা।

Marin

কক্সবাজার শহরের কলাতলী পয়েন্ট থেকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ নির্মাণকাজও শুরু করে। সওজ বিভাগের নিযুক্ত ঠিকাদার কর্তৃক করা কলাতলী মোড় থেকে পাইওনিয়ার হ্যাচারি পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার সড়ক সাগরের প্রবল স্রোত ও ঢেউয়ের ধাক্কায় সাগরেই বিলীন হয়ে যায়।

পরবর্তীতে এই সড়কের নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় সেনাবাহিনীর প্রকৌশল নির্মাণ ব্যাটালিয়নকে। বর্তমানে সড়কটির দৈর্ঘ্য বেড়ে ৪৮ কিলোমিটার থেকে ৮০ কিলোমিটার করা হয়েছে।

২০১৪ সালের জুলাই থেকে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করে সেনাবাহিনী। তিন ধাপে নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে কলাতলী থেকে ইনানী পর্যন্ত ২৪ কিলোমিটার, দ্বিতীয় ধাপে ইনানী থেকে শীলখালী ২৪ কিলোমিটার ও তৃতীয় ধাপে শীলখালী থেকে টেকনাফের সাবরাং পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। তৃতীয় ধাপের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হবে জুন মাসের মধ্যে। সড়কটি নির্মাণে ব্যয় বাড়িয়ে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪৫৬ কোটি টাকা।

সওজ বিভাগ সূত্র আরও জানায়, মেরিন ড্রাইভ সড়কটির দুই পাশে থাকবে ওয়াকওয়ে। পর্যটকদের সুবিধার্থে থাকবে সড়কজুড়ে ফেক্সিবল পেভমেন্ট, শেড, গাড়ি পার্কিং ও চেঞ্জিং রুমের ব্যবস্থা। ৮০ কিলোমিটার সড়কে তিনটি বড় আরসিসি সেতু, ৪২টি কালভার্ট, তিন হাজার মিটার সসার ড্রেন ও ৫০ হাজার মিটার সিসি ব্লক ও জিও টেক্সটাইল। সেনাবাহিনী নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করবে।

সীমান্তবর্তী টেকনাফ পৌরসভার আউলিয়াবাদ এলাকার বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ কক্সবাজার জেলা শহরে একটি বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।

Marin

যাতায়ত করেন বাড়ি থেকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক ব্যবহার করে। কক্সবাজার সরকারি কলেজে পড়াকালীন সময়েও নিজ বাড়ি থেকে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক হয়ে কলেজে যাতায়াত করতেন।

সেই অতীত দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়ক হয়ে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার পৌঁছাতে ৩ ঘণ্টার বেশি সময়ের প্রয়োজন হতো। অথচ মেরিন ড্রাইভ সড়ক ব্যবহার করে মাত্র এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে কক্সবাজার শহরে যাতায়াত করা যায়। যাত্রাপথে সড়কটির প্রাকৃতিক পরিবেশ মন জুড়িয়ে দেয়। অন্যরকম এক ভালোলাগার শিহরণ জাগায় মনে।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজর সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, এই সড়ক ঘিরে ইতোমধ্যে উখিয়া-টেকানাফের মানুষের জীবনযাত্রার মান বদলাতে শুরু করেছে। বাড়ছে সড়কের আশপাশের জমির দাম। দেশের বড়-বড় ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনৈতিক, সরকারি-বেসরকারি সংস্থার উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারাও জমি কিনছেন। গড়ে তুলছেন বহুতল স্থাপনা। এক কথায় সড়কটি ঘিরে অফুরন্ত পর্যটন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

কক্সবাজার সোসাইটির সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক এই অঞ্চলে বিশ্ব পর্যটনের দুয়ার খুলে দিয়েছে। ইতোমধ্যেই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে সড়কটি। পথ চলতে চলতে পাহাড় ও সমুদ্রের অপরূপ মেলবন্ধন দেখে মোহিত হচ্ছেন পর্যটকরা।

উখিয়া-টেকনাফ আসনের সাংসদ আব্দুর রহমান বদি বলেন, কক্সবাজারবাসীর স্বপ্নের মেরিন ড্রাইভ সড়কটি প্রথমে জেলা শহর থেকে উখিয়া উপজেলার ইনানী পর্যন্ত নির্মাণ করার পরিকল্পনা ছিল। নবম জাতীয় সংসদে আমি প্রস্তাব দেই, সড়কটি টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত সম্প্রসারণে।

এর পেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক ইচ্ছায় এটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এখন সড়কটি শুধু কক্সবাজার বা গোটা দেশের নয় বরং বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় ও নান্দনিক একটি সড়কে পরিণত হয়েছে। পিছিয়ে থাকা এই জনপদ সমৃদ্ধ হবে অর্থনৈতিকভাবে।

সায়ীদ আলমগীর/এএম/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।