২৬ বছর ধরে রক্ত দিচ্ছে ওরা
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা শহরের প্রফেসরপাড়া এলাকার অরুপ রায় (১৩)। সাড়ে চার বছর বয়সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। চিকিৎসক পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে বলেন অরুপ থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। তারপর থেকে তাকে প্রতি মাসে দু-তিন ব্যাগ রক্ত দিতে হয়। পলাশবাড়ী এসএম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণিতে পড়ে সে।
অরুপের বাবা বিজন কুমার রায় বলেন, ২০০৮ সালের শেষ দিকে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় অরুপকে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে ভর্তি করি। কোথাও রক্ত সংগ্রহ করতে না পেরে হতাশ হয়েছিলাম। তখন দুজন ছেলে ও একজন মেয়ে এসে খোঁজখবর নিলেন। তারপর আমাকে সঙ্গে নিয়ে এক ব্যাগ রক্ত দিলেন। তারপর থেকেই তারা আমার ছেলেকে রক্ত দিয়ে সহযোগিতা করছে। তাদের সেবায় আমি সন্তুষ্ট।
অরুপের মতো ৮-১০ জন থ্যালাসেমিয়া ও ক্যান্সার রোগীকে রক্ত দেয় সন্ধানী ডোনার ক্লাব। এর সদস্যরা হাসপাতালে গিয়ে নিয়মিত রোগীদের খোঁজখবর নেন। তাদের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়।
গাইবান্ধা সন্ধানী ডোনার ক্লাব কার্যালয় সূত্র জানায়, গাইবান্ধার এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটি কলেজ পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা পরিচালিত। ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর গাইবান্ধা সরকারি কলেজের বিএনসিসি কার্যালয় থেকে যাত্রা শুরু করে এ সংগঠনটি। ১৯৯১ সালের ১৫ জানুয়ারি মিজানুর রহমান রকেট নামে এক ছাত্রের রক্ত নিয়ে শুরু হয় রক্ত সংগ্রহ অভিযান। পরবর্তীতে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে হয় স্থায়ী কার্যালয়। প্রথম বছরেই বিভিন্ন গ্রুপের মোট ২৮১ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ হয়।
গত ২৬ বছর চার মাসে ৩০ হাজার ২৪৭ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করেছে সন্ধানী। আর এই সংগ্রহ করা রক্ত নিয়ে উপকৃত হয়েছে এমন রোগীর সংখ্যা ২৭ হাজার ১০৩ জন। স্বেচ্ছাসেবী এই সংগঠনে ২৪ ঘণ্টা সেবা দিচ্ছে জেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১৯ জন সদস্য।
সূত্রটি আরও জানায়, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্নস্থানে ক্যাম্প করে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। গড়ে প্রতিমাসে প্রায় ২০০ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ এবং ১৮০ ব্যাগের মতো রক্ত প্রদান করা হয় হাসপাতাল ও বিভিন্ন ক্লিনিকগুলোতে। এছাড়া বিনামূল্যে ওষুধ, শীতবস্ত্র বিতরণসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বল্প এবং বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা হয়।
সন্ধানী থেকে রক্ত পেয়ে উপকৃত হয়েছেন ফুলছড়ি উপজেলার পশ্চিম ছালুয়া গ্রামের শাহাদুল ইসলাম (২৩)। অসুস্থ হয়ে পড়লে ডাক্তার জানান তিনি থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত। তারপর থেকে প্রতিমাসে দুই-তিন ব্যাগ রক্ত শরীরে দিতে হয়।

শাহাদুল ইসলাম বললেন, প্রায় নয় বছর থেকে রক্ত নিয়ে বেঁচে আছি। কালিরবাজার এলাকায় একটি ছোট্ট পানের দোকান করি। আয় খুব কম। রক্ত পরীক্ষা-নীরিক্ষার টাকা না থাকলে তাদের সহযোগিতা নিই।
তাদের মতো পলাশবাড়ী উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়নের ছলিম উদ্দিন রক্ত নিয়েছেন ১৯৯১ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত। সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নের রুবেল মিয়া রক্ত নেন প্রায় ১০ বছর ধরে। সাধারণ রোগীদের পাশাপাশি জেলার প্রায় ৩০ জন থ্যালাসেমিয়া ও ক্যান্সার রোগী সন্ধানীর কাছ থেকে উপকার পাচ্ছেন।
সন্ধানীর সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব হাসান সুমন জাগো নিউজকে বলেন, রোগীর স্বজনরা দালালদের খপ্পরে পড়ে রক্ত কিনে যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, তেমনি নেশাগ্রস্ত মানুষের রক্ত রোগীর শরীরে প্রবেশ করায় রোগীর ভালোর চেয়ে খারাপই হচ্ছে বেশি। তাই তাদেরকে আমরা সচেতন করে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করি।
এদিকে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করতে প্রতিবছর সর্বোচ্চ রক্তদাতাদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা দেয়া হয়। এতে মানুষের রক্তদানে উৎসাহ বেড়েছে। কিন্তু নানা সমস্যার কারণে নিখুঁতভাবে সেবা দেয়া যাচ্ছে না।
সন্ধানীর উপদেষ্টা নাহিদ হাসান চৌধুরী রিয়াদ বলেন, সন্ধানীতে ব্লাড ব্যাংক উপযোগি ফ্রিজ, ব্লাড পৃথকীকরণ ও পরিমাপক যন্ত্র নেই। এসবের জন্য বিভিন্ন দফতরে আবেদন করেও কোনো কাজ হচ্ছে না।
সন্ধানীর সভাপতি ও গাইবান্ধা সিভিল সার্জন ডা. মো. আমির আলী জাগো নিউজকে বলেন, গাইবান্ধা জেলায় কোনো ব্লাড ব্যাংক নেই। সন্ধানী ২৬ বছর ধরে গাইবান্ধার মানুষের রক্তের চাহিদা পূরণ করছে। তাই সন্ধানীর সদস্যদের সবসময় উৎসাহ দেই।
এমএএস/জেআইএম