সন্তানের শোকে নির্বাক মা-বাবা!
‘তোমরা হামার ছোলোক আনি দ্যাও, হামার ছোলের কোনো দোষ আছিল না। হামরা ওই গাড়িত (পুলিশের মাইক্রোবাস) যাবার চাছিলাম কিন্তু হামাক ওরা নেয় নাই।’
এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বললেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামের পুলিশের হেফাজতে থাকা ট্রাকচাপায় নিহত কলেজছাত্র রিপন চন্দ্র দাসের মা শ্রীমতি সুযোগী রানী। বাবা বাবলু চন্দ্র দাসও এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন।
জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে গাইবান্ধা-সুন্দরগঞ্জ সড়কের চৌরাস্তা বাজার থেকে আধা কিলোমিটার পূর্ব দিকে হাতিয়া গ্রাম। রোববার দুপুর ১টার দিকে ওই গ্রামে ঢুকতেই দেখা গেল সুন্দরগঞ্জ থানার প্রায় ১২ জন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন। তারা সড়ক ধরে চলাফেরা করছেন।
রিপন চন্দ্রের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, আঙ্গিনায় রিপনের শ্রাদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। মা-বাবা কান্নাকাটি করছেন। আশেপাশের বিভিন্ন বাড়ি থেকে মানুষ এসে ভীড় করছেন।
সুন্দরগঞ্জ থানার পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ মে রিপন চন্দ্র দাস হাতিয়া গ্রামের একটি মেয়েকে (১৪) অপহরণ করে। এই ঘটনায় ওই মেয়েটির বাবা রিপন চন্দ্র দাসকে আসামি করে ৩১ মে রাতে সুন্দরগঞ্জ থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বগুড়ার কাহালু উপজেলা শহরের একটি বাড়ি থেকে ওই মেয়েটিকে উদ্ধার করা হয়।
এ সময় রিপন চন্দ্র দাসকে গ্রেফতার করে একটি মাইক্রোবাসে করে সুন্দরগঞ্জে আনা হচ্ছিল। পথে রিপন প্রস্রাব করার কথা বললে পুলিশ তাকে মহাসড়কের পাশে নামিয়ে দিলে রিপন প্রস্রাব শেষ না করেই দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। সেসময় রংপুরগামী একটি ট্রাকের ধাক্কায় রিপন চন্দ্র দাস ঘটনাস্থলেই মারা যায়।

তিন ভাইয়ের মধ্যে রিপন সবার বড়। সে লক্ষ্মীপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিল। দ্বিতীয় ভাই পন্ডিত চন্দ্র দাস সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা উমেশ চন্দ্র উচ্চবিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে ও তৃতীয় ভাই শিপন চন্দ্র দাস বজরা হলদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে।
ভস্ম না করেই (আগুন দিয়ে না পুড়িয়ে) বাড়ি সংলগ্ন একটি স্থানে শনিবার দুপুরে রিপনের মরদেহ নিয়মানুযায়ী সৎকার করে মাটিতে রাখা হয়।
ওই গ্রামের কলেজছাত্র বিপুল সরকার বলেন, রিপন খুব ভালো ছেলে। এলাকায় তার অনেক সুনাম রয়েছে। সে ভালো ফুটবল খেলোয়াড়ও ছিল।
রিপন চন্দ্রের বাড়ি থেকে ২০০ গজ দক্ষিণে ওই মেয়েটির বাড়ি। সেই বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। গত শুক্রবার দুপুরের দিকে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে মেয়েটির বাবার বাড়িতে ভাঙচুর করে। এরপর থেকে তারা আর এলাকায় থাকেন না।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিন বছর আগে থেকে রিপন চন্দ্র দাসের সঙ্গে ওই প্রেমেটির প্রেমের সম্পর্ক হয়। ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হলে মেয়েটির মতের বিরুদ্ধে বিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছিল। ফলে তারা দুজনেই গত ২৫ মে পালিয়ে যায়।
বাবা বাবলু চন্দ্র দাস বলেন, আমি মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমার কাছে এসআই রাজু ২০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। টাকা না পেয়ে রিপনকে হত্যা করা হয়।
রিপনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে চার পুলিশ সদস্যকে শুক্রবার রাতে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই ঘটনায় সহকারী পুলিশ সুপার (বি-সার্কেল) মইনুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ আতিয়ার রহমান রাত ৯টায় মুঠোফোনে জাগো নিউজকে বলেন, রিপনের পরিবারের কাছে টাকা চাওয়ার অভিযোগ মিথ্যা। রিপন চন্দ্র দাসের মৃত্যুর ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এলাকায় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে ওই গ্রামে পুলিশ মোতায়েন আছে। পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে।
রওশন আলম পাপুল/এএম/পিআর