হারিয়ে যাচ্ছেন মোসলেমরা


প্রকাশিত: ১১:১৪ এএম, ০৯ জুন ২০১৭

কখনও বাড়ির উঠোনে, কখনও ফাঁকা জমিতে আয়োজকরা সামিয়ানা টানিয়ে চৌকি দিয়ে সাজাতেন মঞ্চ। চারদিকে ধানের খড় বিছানো। খড়ের উপর বসা উপচেপড়া দর্শক। মঞ্চে শুরু হতো যাত্রাপালা। যাত্রাভিনয়ের ফাঁকে ফাঁকে বাজতো দোতরা, তবলা, ডুগি, কেচিয়া, খঞ্জন, ঝানঝুড়ি ও একতারা।

এসব বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে মোসলেম উদ্দিন গাইতেন ওকি গাড়িয়াল ভাই..., গাড়ি না ধরিয়া নাইরি গেল চলিয়া..., দোলা মাটির বতুয়া শাক... প্রভৃতি জনপ্রিয় সব আঞ্চলিক গান।

রাত আটটা নয়টার দিকে শুরু হয়ে আসর চলতো ভোর অবধি। এভাবেই যাত্রাপালায় নায়কের অভিনয় এবং গান গেয়েই জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। কিন্তু ভিনদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন ও আধুনিক সংস্কৃতির কারণে যাত্রাপালার মতো গ্রামীণ সংস্কৃতি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে মোসলেম উদ্দিন অন্য পেশা বেছে নেন। মোসলেম উদ্দিনের মতো জেলার তিন শতাধিক যাত্রাশিল্পী এই পেশা ছেড়ে অন্যপেশা বেছে নিয়েছেন।

১৯৫১ সালে গাইবান্ধা সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের পার্বতীপুর গ্রামে মোসলেম উদ্দিনের জন্ম। তার বর্তমান বয়স ৬৬ বছর। ১৯৭৫ সালে বিয়ে করেন মোসলেম উদ্দিন। তার দুই ছেলে এক মেয়ে। মেয়ে সুমি খাতুন ও স্ত্রী সাদা রানী ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন।

স্ত্রী সাদা রানী বলেন, যাত্রাপালা চালু থাকতে সংসার ভালো চলতো। এছাড়া তিনি আর (স্বামী) অন্য কোনো কাজ শেখেন নি। এখন আমার ও মেয়ের চাকরির টাকায় কোনোমতে কষ্ট করে সংসার চলছে।

১৯৬৫ সাল থেকে গ্রামে গ্রামে গান করে বেড়াতেন মোসলেম উদ্দিন। ওই সালেই তিনি যাত্রাপালার একটি দল গঠন করেন। নাম দেন ‘মৌসুমি যাত্রাপালা’। এই যাত্রাপালায় ৯৫ জন সদস্য ছিলো। যাত্রাপালায় অভিনয় ও গান গেয়ে দৈনিক ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হতো যথন।

কিন্তু ভিনদেশি সংস্কৃতির আগ্রাসন ও আধুনিক সংস্কৃতির কারণে এ ধরনের গ্রামীণ সংস্কৃতি বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয় তার আয়ের পথ। বাধ্য হয়ে তিনি দোতরা, তবলা, ডুগি, কেচিয়া, খঞ্জন, ঝানঝুড়ি ও একতারা বিক্রি করে সংসার চালান।

১৯৮৩ সালে বাড়ির পার্শ্ববর্তী বালুয়া বাজারে পানের দোকান দেন। ছয়বছর পানের দোকান করেন। মূলধনের অভাবে ১৯৮৯ সালের দিকে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকে তিনি বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। তার সহকর্মীরাও অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। এরপর থেকে তিনি স্ত্রী ও মেয়ের আয় দিয়ে কোনোমতে জীবন চালাচ্ছেন।

ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া গ্রামের যাত্রাশিল্পী আবদুল গফুর বলেন, যাত্রাপালা দেখে নিজেও একসময় তাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। যাত্রাপালায় অভিনয় করে অনেক সুনাম পেয়েছি। জেলা ও জেলার বাইরে থেকেও মানুষ এসে আমাদের খুঁজতো। কিন্তু এখন আর সেসব দিন নেই। পেটের তাগিদে অন্য পেশা বেছে নিতে বাধ্য হয়েছি।

মোসলেম উদ্দিন বলেন, আমি প্রায় ৫০ বছর ধরে যাত্রাপালা ও আঞ্চলিক গান হৃদয়ে লালন করছি। সরকার আমার মতো শিল্পীদের পুনর্বাসন করুক- এটাই আমি চাই।

জেলা শিল্পকলা একাডেমির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক চুনি ইসলাম বৃহস্পতিবার বিকেলে জাগো নিউজকে বলেন, আঞ্চলিক গান ও যাত্রাপালা গ্রামীণ সংস্কৃতির শেকড়ের সন্ধান দেয়। তাই আধুনিক সংস্কৃতির পাশাপাশি এসব টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।

এমএএস/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।