অাতঙ্কের নাম ‘রামদা সুমন’

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি বরগুনা
প্রকাশিত: ০৭:১৯ এএম, ২২ আগস্ট ২০১৭

বরগুনার বেতাগীতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষিকাকে ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত সুমন বিশ্বাস। বেতাগী উপজেলার হোসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা গ্রামের এই সুমন এলাকায় ‘রামদা সুমন’ নামেই বেশি পরিচিত।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মন্টু বিশ্বাসের ছত্রছায়ায় এলাকায় তিনি গড়ে তুলেছেন ১০-১২ জনের একটি বাহিনী। এই বাহিনীর প্রধান সুমন বিশ্বাস ওরফে রামদা সুমনের নেতৃত্বে এলাকায় মাদক বিক্রিসহ চলে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রম।

বিভিন্ন সময় দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে এলাকায় প্রকাশ্যে মহড়া দেন সুমনের নেতৃত্বে এই বাহিনী সদস্যরা। তাই কদমতলা ও এর আশেপাশের গ্রামে যথারীতি এক আতঙ্কের নাম ‘রামদা সুমন’।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় থেকে শুরু করে দূর-দুরান্ত থেকে বেড়াতে আসা মানুষদেরও বিভিন্নভাবে হয়রানি করেন সুমন ও তার বাহিনীর সদস্যরা।

চলতি বছরের জুন মাসের শেষের দিকে শতধিক মানুষের সামনে হোসনাবাদ ইউনিয়নের টানা পাঁচবারের নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মাকসুদুর রহমান ফোরকানের শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করার হুমকিও দিয়েছিলেন এই সুমন।

মাস দুই আগে বেতাগীর উপজেলার জলিসারহাটে একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট চলাকালে বাবার সামনে ইমন নামের এক যুববকে নির্মম নির্যাতন করেছিলেন সুমন ও তার সহযোগীরা। চোখের সামনে ছেলের প্রতি নির্মম নির্যাতন দেখে ঘটনাস্থলেই স্ট্রোক করে মারা যান নির্যাতিত ওই যুবকের বাবা মো. মোস্তফা জোমাদ্দার। এ ঘটনায় সুমনের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস পায়নি নিহতের পরিবার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কদমতলা এলাকার হিরণ বিশ্বাসের ছেলে সুমন বিশ্বাস। গত ইউপি নির্বাচনের আগে তিনি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়ানোয় এলাকায় তার অনুসারী গড়ে ওঠে এবং ছোটখাট অপরাধ প্রবণতা চালাতে থাকেন।

সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে তার চাচাত ভাই মন্টু বিশ্বাস ইউপি সদস্য প্রার্থী হলে তার পক্ষে প্রচরাণায় নামেন সুমন। ওই নির্বাচনে ভাইয়ের পক্ষে প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া দিয়ে আলোচনায় আসে সুমন। নির্বাচনে মন্টু বিশ্বাস জয়লাভ করার পর সুমনকে মোটরসাইকেল কিনে দেন।

এর পরপরই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন সুমন। অনুসারীদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘রামদা বাহিনী’। মাদক বিক্রির পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো, বাবার সামনে ছেলেকে নির্যাতন, ইউপি চেয়ারম্যানকে হত্যার হুমকি, একের পর এক নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন সুমন। তার এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রত্যক্ষ মদদ দেন প্রভাবশালী ইউপি সদস্য মন্টু বিশ্বাস।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুমনের এক সহযোগী কদমতলা এলাকার এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে। এতে কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে কিশোরীর পরিবারকে হুমকি এবং এ ঘটনার অভিযুক্তের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত কারার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেড় লাখ টাকা টাকা হাতিয়ে নেন সুমন ও তার প্রশ্রয় দাতা মন্টু মেম্বার।

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে প্রভাব বিস্তার করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর হামলার একাধিক অভিযোগ রয়েছে এই সুমনের বিরুদ্ধে।

মোকামিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চার নং ওয়ার্ডের সদস্য ও নির্যাতিত শিক্ষিকার স্কুলের ম্যনেজিং কমিটির সদস্য মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবারের ঘটনা তিনি স্থানীয়দের কাছে শুনে তাৎক্ষণিক স্কুলে যান। সেখানে গিয়ে তিনি ওই শিক্ষিকার আর্তচিৎকার শুনে তার কাছে যান।

পরে তার কাছে ঘটনা শুনে তিনি সংশ্লিষ্ট মোকামিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল আলম সুজনকে ফোন দেয়া শুরু করেন। এ সময় পাশ থেকে এসে মন্টু মেম্বার তাকে ফোন দিতে নিষেধ করে বলেন, ‘বিষয়টি কাউকে জানানোর দরকার নেই। আমরা দুই মেম্বারই ঘটনাটির সালিশ করে দেই।’ পরে তিনি তার কথা উপেক্ষা করে চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানান।

ইউপি সদস্য দেলোয়ার হোসেন আরও বলেন, আমার ইউনিয়নের পাশের গ্রাম হোসনাবাদ ইউনিয়নের কদমতলা এলাকার বাসিন্দ সুমন। সুমন হোসনাবাদ ইউনিয়ন থেকে এসে মোকামিয়া ইউনিয়নের ওই স্কুল সংলগ্ন এলাকায় মাদক বিক্রি ও সেবনসহ স্থানীয় হিন্দু পরিবারের স্কুলগামী কিশোরী ও নারীদের বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত করে। কিন্তু সুমনের ভয়ে ওইসব হিন্দু পরিবারের সদস্যরা কখনো কোথাও অভিযোগ করার দুঃসাহস করেনি।

ওই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আবদুল মান্নান বলেন, বছরে তিনেক আগের এক রাতে আমার একমাত্র ছেলে মো. তাইজুল ইসলামের চোখে মরিচের গুড়া দিয়ে কুপিয়ে যখম করেছিল সুমন ও তার সহযোগীরা। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর অনবরত হুমকি দিয়ে আসছে সুমন ও তার সহযোগীরা। বর্তমানের মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে।

সুমন ও তার সহযোগীদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার ইমন বলেন, জলিসার বাজারের ঘটনায় মারা যাওয়া মোস্তফা জোমাদ্দার আমার বাবা। এ ঘটনার পরে আমি বাদী হয়ে সুমনসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাইলে আমাকে অনবরত হত্যার হুমকি দিতে থাকে সুমন। পরে জীবন সংশয় থাকার কারণে এ ঘটনায় সুমনকে আসামী না করে তার অপর দশ সহযোগীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করি। এতেও সুমন আমাকে অনবরত হুমকি দিয়ে আসছে।

হোসনাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মাকসুদুর রহমান ফোরকান বলেন, মন্টু মেম্বারের মদদে বেপরোয়া সুমনের কাছে এলাকাবাসী জিম্মি। কেউ ভয়ে টু শব্দটিও করতে সাহস পায়নি। সুমন একের পর এক অপরাধ সংগঠিত করেও অদৃশ্য কারণে পার পেয়ে যায়। সুমন আমাকেও প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিয়েছিল।

এ বিষয়ে হোসনাবাদ ইউনিয়নের এক নং ওয়ার্ডের সদস্য ও সুমনের প্রশ্রয়দাতা মন্টু মেম্বারের সঙ্গে মোবাইল ফেনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

বরগুনার পুলিশ সুপার (এসপি) বিজয় বসাক পিপিএম বলেন, শিক্ষিকাকে নির্যাতনের ঘটনার জের ধরে সুমনের ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে নানা অপরাধের বিষয়টি উঠে এসেছে। আমরা তার ব্যাপারে সব ধরনের খোঁজ নিচ্ছি। অপরাধ করে কেউ কখনো পার পায়নি। আমরা এ ব্যাপারে তৎপর রয়েছি। সুমনসহ তার সহযোগীদের গ্রেফতারে সর্বোচ্চ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

সাইফুর ইসলাম মিরাজ/আরএআর/আরআইপি/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।