রসুন আমদানিতে এত লাভ!

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৬:২৬ পিএম, ১০ মার্চ ২০২৬
রসুন আমদানি করে অস্বাভাবিক লাভ করছেন ব্যবসায়ীরা/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

আমদানি করা বড় রসুনের চাহিদা বেশি। অথচ আমদানি কম। বাজারে সংকট। সুযোগ বুঝে অস্বাভাবিক মুনাফা করছেন আমদানিকারকরা।

পাইকারি বিক্রেতা, আড়তদার ও ভোক্তা সংগঠনগুলো দায় চাপাচ্ছেন আমদানিকারকদের ওপর। তবে আমদানিকারকদের দাবি- বিগত সময়ে লোকসান দিতে গিয়ে পুঁজিহারা হয়ে অনেকে এবছর রসুন আমদানির এলসি খুলতে পারেননি। যে কারণে দেশে চাহিদামাফিক রসুন আমদানি হয়নি। ফলে দাম বেশি।

এক কেজি ১৩০-১৪০ টাকায় আমদানি করা রসুন ২০০-২১০ টাকায় বিক্রি করছেন আমদানিকারকরা। এতে প্রতি কেজি রসুন আমদানিতে লাভ তুলে নিচ্ছেন ৭০ টাকা। একই রসুন খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ২৫০-২৬০ টাকা কেজিতে। দেশি রসুন বিক্রি হচ্ছে কেজি ৯০-১০০ টাকায়। তবে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, বাজারে আমদানি করা রসুন ২২০-২৪৫ টাকা এবং দেশি রসুন ৮০-১৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

রসুন আমদানিতে এত লাভ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত রসুন আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৪২ টন ৪২৩ কেজি। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে রসুন আমদানি হয়েছে ৫৬ হাজার ৮৭৩ টন ৭০৫ কেজি। এতে বছরের ব্যবধানে রসুন আমদানি কমেছে ৭২ হাজার ৬৬৮ টন ৭১৮ কেজি।

চট্টগ্রামের বাজারে প্রতিদিন ১০ কনটেইনার রসুন লাগবে। কিন্তু ৫ কনটেইনারও বাজারে আসছে না। বন্দরে কোনো রসুন নেই, যা এসেছে তাও বিক্রি হয়ে গেছে। সরবরাহ কম থাকায় রসুনের অস্বাভাবিক দাম বেড়েছে। -হামিদ উল্লাহ মিয়া বাজারের ব্যবসায়ী আবু তৈয়্যব

৮ মার্চ পর্যন্ত গত ৩০ দিনে আমদানি হয়েছে ৫ হাজার ৪২৭ টন ৭শ কেজি। চায়নার পাশাপাশি ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়েও এসব রসুন এসেছে বাংলাদেশে।

আরও পড়ুন

ভারতীয় পেঁয়াজকে টেক্কা দিচ্ছে দেশি ‘হালি পেঁয়াজ’, দামও নাগালে
ডিলার সিন্ডিকেটেই বাড়ছে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম
পেঁয়াজ সংরক্ষণে এয়ার ফ্লো মেশিন, বাজিমাত কৃষি বিভাগের

গত ৭ মার্চ কনটেইনার জাহাজ এমএসসি জিয়ান্নিনা-২ চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। ওই জাহাজে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ১৩ প্রতিষ্ঠানের নামে ২৭ কনটেইনার রসুন আমদানি হয়। খালাস হওয়ার পরপরই বেশিরভাগ রসুন ২০০-২১০ টাকা কেজিতে বন্দর থেকেই বিক্রি করেন আমদানিকারকরা। প্রতি কনটেইনারে ২৯ টনের কমবেশি রসুন আসে। এতে এক কনটেইনারেই প্রায় ২০ লাখ টাকা লাভ তুলে নেন আমদানিকারকরা।

রসুন আমদানি

ঢাকার রসুন আমদানিকারক তাতিথি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং। ওই জাহাজে তাদেরও রসুন আসে। কথা হলে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মনিরুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে রসুন আমদানি করে মানুষ লোকসান দিতে দিতে পুঁজি হারিয়ে ফেলেছে। যে কারণে এ বছরের শুরুতে অনেক আমদানিকারক নতুন করে আর এলসি করার সাহস পাননি। এ কারণে আমদানি কম হয়েছে। এখন বাজারে রসুন নেই বললেই চলে। ফলে দাম বেড়েছে। এখানে সিন্ডিকেট বলে কিছু নেই।’

রসুন তো আর ইরান কিংবা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি হয় না। রসুন আসে চীন থেকে। ওখানে তো যুদ্ধ নেই। রসুনের দাম কেন এত বেশি বেড়ে যাবে। প্রতি কেজিতে আমদানি পর্যায়ে ৭০ টাকা লাভ কোনোভাবেই কাম্য নয়।-ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন

তিনি বলেন, ‘ভোক্তারা এমনিতে চায়না রসুন পছন্দ করে। অথচ বাজারে দেশি রসুন এসেছে। প্রতি কেজি ৪৫-৬০ টাকায় দেশি রসুন পাওয়া যাচ্ছে। এখন নতুন করে অনেকে এলসি করছেন। ঈদের পরের সপ্তাহে দেখা যাবে, অনেক রসুন বন্দরে চলে এসেছে। তখন দাম আর থাকবে না।’

রসুন আমদানি

একই মন্তব্য চট্টগ্রামের রসুন আমদানিকারক মেসার্স জিয়াউর রহমানের স্বত্বাধিকারী জিয়াউর রহমানের। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত দুই বছর ধরে সবাই লোকসান দিয়েছে। এজন্য এবার এলসি করেনি। এখন অনেকে নতুন করে এলসি খুলেছেন। আগামী ১৫-২০ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

আমদানিকারকদের বক্তব্যের সত্যতা মেলে বেশ কয়েকজন আড়তদারের বক্তব্যেও। তবে বিপরীত মতও রয়েছে। চাক্তাইয়ের আড়তদার ব্যবসায়ী মেসার্স বশর অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী আবুল বশর জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি গত বছর রসুন আমদানি করেছিলাম। কিন্তু ধারাবাহিক লস দিয়েছি। এবার এলসি করতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে লোকসান দেওয়ার কারণে অনেক ব্যবসায়ী এবার এলসি খোলেননি। ফলে রসুন কম আমদানি হয়েছে। এখন যেহেতু বাজারে দাম বাড়তি। নতুন করে অনেকে দ্রুত এলসি খুলবেন। এতে মাসের ব্যবধানে রসুনের দাম কমে আসবে। পাইকারি বাজারে দেশি রসুন ৫৫-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।’

রসুন আমদানি

হামিদ উল্লাহ মিয়া বাজারের ব্যবসায়ী আবু তৈয়্যব বলেন, ‘চট্টগ্রামের বাজারে প্রতিদিন ১০ কনটেইনার রসুন লাগবে। কিন্তু ৫ কনটেইনারও বাজারে আসছে না। বন্দরে কোনো রসুন নেই, যা এসেছে তাও বিক্রি হয়ে গেছে। সরবরাহ কম থাকায় রসুনের অস্বাভাবিক দাম বেড়েছে।’ বর্তমানে আড়ত থেকে পাইকারিতে ২১৫-২১৮ টাকা কেজিতে চায়না রসুন বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সামনের কয়েকদিনে চায়না রসুনের দাম আরও বাড়বে বলে মন্তব্য করেন খাতুনগঞ্জের লামার বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত বছর রসুন আমদানি করে লাগাতার লোকসান দিয়েছেন আমদানিকারকরা। তখনও কেজিপ্রতি ১৩০ টাকা কস্টিং হয়েছিল। কিন্তু বিক্রি হয় ৯০-১১০ টাকা কেজিতে। প্রত্যেক চালানেই আমদানিকারকদের লোকসান দিতে হয়েছিল। যে কারণে অনেকে এবার এলসি করতে আগ্রহ দেখাননি। আমদানি একেবারে কম হওয়ায় বাজারে হু হু করে দাম বাড়ছে রসুনের।’ আগামী কয়েকদিনে কেজিতে আরও ১০-২০ টাকা বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাজারে প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই। এ সুযোগ নেয় অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা। রসুন তো আর ইরান কিংবা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি হয় না। রসুন আসে চীন থেকে। ওখানে তো যুদ্ধ নেই। রসুনের দাম কেন এত বেশি বেড়ে যাবে। প্রতি কেজিতে আমদানি পর্যায়ে ৭০ টাকা লাভ কোনোভাবেই কাম্য নয়।’

এমডিআইএইচ/এএসএ/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।