সিন্ডিকেটে চাল : সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে বাড়ল ৩ টাকা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ০৭:৪৪ এএম, ৩০ আগস্ট ২০১৭

সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে চাল আমদানি সত্ত্বেও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ায় গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের চালের দাম কেজি প্রতি ৩ টাকা বেড়েছে। ঈদের পর এই দাম আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করছেন মিল মালিকরা। ব্যবসায়ীরা এর জন্য ধানের দাম বৃদ্ধি ও চিকন ধানের সঙ্কটকে দায়ী করলেও খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ সিন্ডিকেটের কারসাজিতে বেড়েছে চালের দাম।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগর এলাকার কয়েকজন মিল মালিক এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত সপ্তাহে মিনিকেট চাল কেজি প্রতি ৫০ টাকা, বাসমতি ৬২ ও আটাশ চাল ৪৬ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছিল। অথচও চলতি সপ্তাহের শনিবার থেকে এই মিনিকেট চাল কেজি প্রতি ৫২, বাসমতি ৬৪ ও আটাশ চাল ৪৮ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ মাত্র সাতদিনের ব্যবধানে এই তিন ধরনের চালের দামই কেজি প্রতি ২ টাকা করে বেড়ে গেছে।

শনিবার খাজানগরের চালের মোকামে যে মিনিকেট ৫২ টাকা দর ছিল সেই মিনিকেট চাল মাত্র একদিনের ব্যবধানে রোববার ৫৩ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মোকামে চালের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। খুচরা বাজারে সব ধরনের চাল গত সপ্তাহের চেয়ে কেজি প্রতি ২ থেকে ৩ টাকা বেড়ে গেছে।

হঠাৎ চালের দাম কেন বাড়লো এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশীদ জানান, দেশে বন্যার কারণে বিপুল পরিমাণ ধান-চাল নষ্ট হয়ে গেছে। বেশি দামেও ধান পাওয়া যাচ্ছে না। যার প্রভাব পড়েছে ধান ও চালের বাজারে। নতুন ধান না ওঠা পর্যন্ত চালের দাম কমবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। নতুন ধান উঠতে অন্তত আরো মাস চারেক সময় লাগবে।

একই কথা বললেন বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতি কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধান। তার ভাষ্য বন্যায় রাস্তার ভগ্ন দশার কারণে পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে। এসব কারণে চালের দাম বেড়ে যাচ্ছে। গুদামে যে পরিমাণ ধানের মজুদ রয়েছে তা অল্প কিছু দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।

কবুরহাটের দেশ এগ্রোর মালিক এম এ খালেক জানান, তিন মাস আগে যেখানে ৯০০ টাকা মণ দরে ধান কেনা যেত এখন সেই ধান ১৩০০ টাকা মণ দরে কিনতে হচ্ছে। আর মিলে এই ধান আনতে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ লাগছে। এক মণ ধান ভাঙালে ২৬ কেজি পর্যন্ত চাল পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে চালের উৎপাদন খরচ পড়ে যাচ্ছে কেজি প্রতি ৫২ থেকে ৫৩ টাকা। এ অবস্থায় চালের দাম বাড়ানো ছাড়া মিলারদের আর অন্য কোনো পথ খোলা নেই।

সরকার ভারত থেকে চাল আমদানি করছে তারপরও চালের দাম বাড়ছে কেন এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশীদ জানান, ভারত থেকে আমদানি করা চাল অত্যন্ত নিন্মমানের। তাই সরকারের এই চাল আমদানির উদ্যোগ কোনো কাজেই আসছে না।

jagonews24

তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ দেশে সরকারিভাবে মনিটরিং ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ায় যে যার ইচ্ছামত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ায় চালের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। ঢাকা এবং নওগাঁ জেলার কয়েকজন বড় চালের ব্যবসায়ী এই সিন্ডিকেটের মেম্বার। মূলত এই সিন্ডিকেটই সারা দেশের চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এদের হাতের ইশারায় চালের দাম ওঠা-নামা করে।

এদিকে নাম প্রকাশ না করার সত্ত্বে সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা কুষ্টিয়ার চাল সিন্ডিকেটের কথা স্বীকার করে জানান, এই সিন্ডিকেটই বরাবরের মত চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। খাজানগরের কয়েকজন মিলারের গোডাউনে বিপুল পরিমাণ ধান-চালের মজুদ রয়েছে। এসব বিষয় উল্লেখ করে সম্প্রতি ওই গোয়েন্দা সংস্থাটি সরকারের কাছে প্রতিবেদনও দাখিল করেছে বলে জানা গেছে।

অপরদিকে কুষ্টিয়ায় সিন্ডিকেটের কোনো অস্তিত্ব নেই বলে দাবি করে ধান চাল মজুদের কথা স্বীকার করেছেন কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুস সামাদ।

তিনি জানান, ধান ওঠার মৌসুমে মিল চালু রাখার জন্য মিলাররা ধান ক্রয় করে রাখে। যার মিলের যতটুকু ধারণক্ষমতা আছে তারা সেই পরিমাণ ধান মজুদ করে। পরবর্তী সময়ে মিল চালু রাখার জন্য মিলারদের ধান মজুদ করতেই হবে, তা না হলে সারা বছর মিল চালু রাখা সম্ভব হয় না।

সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রশীদ বলেন, দেশের কোন মিল মালিক ধান মজুদ করে না? তদন্ত করে সরকারের কোনো সংস্থা যদি প্রমাণ করতে পারে মিলাররা মজুদের সঙ্গে জড়িত, তাহলে যে শাস্তি দেয়া হবে মিলাররা মেনে নেবে। কুষ্টিয়ার খাজানগরে প্রায় ৩৫০টি চালকল রয়েছে। এর মধ্যে অটোমেটিক চালকলের সংখ্যা ৩১টি। বাকিগুলো সব হাসকিং মিল। বর্তমানে ১৫০টির মত হাসকিং মিল চালু রয়েছে।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. জহির রায়হান বলেন, কেন দাম বেড়ে গেল, দাম বাড়ার যৌক্তিকতা আছে কিনা এসব বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আল-মামুন সাগর/এফএ/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।