বেশি দামে চামড়া কিনে ব্যবসায়ীরা ধরা
খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বড় এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম যশোরের রাজারহাট চামড়ার বাজার জমেনি। মঙ্গলবার ঈদ পরবর্তী প্রথম হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাদের তেমন সমাগম ঘটেনি।
একই সঙ্গে দাম নিয়েও হতাশ ব্যবসায়ীরা। ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিযোগিতার কারণে তারা বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে চড়া দামে চামড়া কিনেছেন। কিন্তু হাটে এসে সেই মূল্য মিলছে না। ফলে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা। এজন্য চামড়ার দাম পুনর্নির্ধারণের দাবি তাদের।
খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বড় এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার বাজার বসে যশোরের রাজারহাটে। ঈদ পরবর্তী সময়ে এ বাজারের দিকে নজর থাকে দেশের শীর্ষস্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীদের।
এ জন্য এখানে ঈদ পরবর্তী কয়েকটি হাটেই কোটি কোটি টাকার চামড়া বিক্রি হয়। তবে এবার তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। ঈদ পরবর্তী হাটে যেমন চামড়া ওঠেনি, তেমনি বিক্রি হয়েছে কম।
এদিকে, যে পরিমাণ চামড়া উঠেছে তার ন্যায্যমূল্যও পাননি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, যে দামে তারা চামড়া কিনেছেন সে দামেও তারা তা বিক্রি করতে পারেননি। বাজারদরের এ অবস্থায় রাজারহাট চামড়া বাজারে ব্যবসায় ধস নেমেছে। এখন লাভ তো দূরের কথা ঋণের টাকা ও লাভ কিভাবে দেবেন তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। হাটে চামড়ার মূল্য না পাওয়ায় অনেকে চামড়া পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, মঙ্গলবার প্রথম হাটে নির্ধারিত দামের চেয়ে সামান্য বেশি দামে পশুর চামড়া বেচাকেনা হয়েছে। তবে তাতেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে।

কারণ মাঠ পর্যায় থেকে তাদের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকায় চামড়া সংগ্রহ করতে হয়েছে। একই সঙ্গে লবণের দামও বেড়েছে। চামড়া পাইকারি বিক্রি করতে এসে আসল বাঁচানো যাচ্ছে না। গরুর চামড়া প্রতি ২০০-৩০০টাকা ও ছাগলের চামড়ায় ৫০-৬০টাকা পর্যন্ত লোকসান গুণতে হচ্ছে।
অপরদিকে, পাইকাররা বলছেন, ঝুঁকি নিয়ে তারা ট্যানারি শিল্প সমিতি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে চামড়া ক্রয় করছেন। পরে ট্যানারি মালিকরা দাম না বাড়ালে বিপদের আশঙ্কা রয়েছে তাদেরও।
মঙ্গলবার সরেজমিনে রাজারহাট চামড়ার হাট ঘুরে দেখা গেছে, হাটে ক্রেতা-বিক্রেতার তেমন হাকডাক নেই। ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগম কম, তাই তুলনামূলক চামড়ার আমদানিও কম। হাটে চামড়া নিয়ে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চোখে মুখেও হতাশার ছাপ।
হাটের পাইকাররা জানান, মঙ্গলবার ঈদ পরবর্তী প্রথম হাট হওয়ায় কোরবানির বেশিরভাগ চামড়া এদিন হাটে আসেনি। অনেকেই বাজার যাচাই করার জন্য অল্প সংখ্যক চামড়া নিয়ে হাটে এসেছেন। তাই পরবর্তী হাট আগামী শনিবারে রাজারহাট জমজমাট হয়ে উঠবে।
রাজারহাটের পাইকারি ব্যবসায়ী মমিনুল মজিদ পলাশ জানান, ক্ষুদ্র ও মৌসুমী ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকায় চামড়া কিনেছেন। তাই তারা বেশি দাম হাঁকছেন। এ জন্য বাধ্য হয়ে তারা ঝুঁকি নিয়ে কিছুটা বেশি দামে চামড়া কিনছেন। যদিও ট্যানারি মালিকরা বেশি দাম দিবে কি না সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চেয়ে পাইকারদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা বেশি বলেও দাবি তার।

আরেকজন পাইকারী ব্যবসায়ী পারভেজ আলম বলেন, প্রথম হাট হওয়ায় এদিন বাজারে চামড়ার আমদানি কম। তবে শনিবারের হাট জমজমাট হবে বলে তিনি আশাবাদী। যদিও হাটে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকায় এদিন চামড়া বেচাকেনা হচ্ছে।
রাজারহাটে চামড়া নিয়ে আসা মাগুরার সীমাখালির ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী চাঁন বিশ্বাস জানান, মৌসুমী ব্যবসায়ীদের কারণে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকায় পশুর চামড়া কিনতে হয়েছে। কিন্তু বাজারে এসে দেখছি মৌসুমী ব্যবসায়ীরা নেই। তারা চামড়া সংরক্ষণ করছেন। আমরা বাজারে এসে ধরা খেয়েছি। চামড়ার দাম কম। কেনা দামের চেয়ে ২০০-৩০০টাকা কম দামে গরুর চামড়া বিক্রি করতে হচ্ছে।
এছাড়া লবণের দাম ঈদের পরপরই বেড়েছে। তাই সব খরচও বেড়েছে। এবার এনজিও থেকে ১ লাখ টাকা লোন (ঋণ) নিয়ে চামড়া কিনেছি। বাজার দরের যে অবস্থা তাতে পুঁজি বাঁচবে বলে মনে হচ্ছে না।
যশোর সদর উপজেলার সুজলপুর গ্রাম থেকে চামড়া বিক্রি করতে আসা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী গোপাল দাস জানান, গ্রামে গ্রামে ঘুরে কোরবানির গরুর ৪০টি ও ছাগলের ৪০টি চামড়া সংগ্রহ করেছেন। প্রত্যেকটি গরু চামড়া ১৪০০-১৬০০ টাকা ও ছাগলের চামড়া ১০০-১৫০ টাকায় কিনেছেন। কিন্তু হাটে বিক্রি করতে এসে তিনি হতাশ। কেনা দামেও বিক্রি হচ্ছে না। গরুর চামড়ায় ২০০ টাকা আর ছাগলের চামড়ায় ৫০-৬০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুণতে হয়েছে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাধবকাটি গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী প্রফুল্ল দাস বলেন, এবার চামড়া পাচারের কোনো আশঙ্কা নেই। সীমান্তের চামড়া হাটে আসছে। তবে গত বারের তুলনায় এবার কোরবানি কম হয়েছে। এ জন্য হাটে চামড়া কম।
যশোর জেস লেদারের মালিক হাজি এম আলী জানান, খুলনার একটি ট্যানারি কারখানা এ অঞ্চলের মসজিদ-মাদরাসা থেকে সরাসরি প্রায় ২৫ হাজার পিস পশুর চামড়া সংগ্রহ করেছে। এ জন্য আজকের হাটে চামড়া কম এসেছে।
যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, ঈদুল আজহা পরবর্তী প্রথম হাটে চামড়া কম উঠেছে। তবে এদিন নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকায় চামড়া বেচাকেনা হয়েছে। আগামী শনিবার দ্বিতীয় হাটবারে রাজারহাট জমজমাট হয়ে উঠবে বলেও আশাবাদী তিনি।
মিলন রহমান/এএম/আইআই