ধানের চারার দাম দ্বিগুণ, বিপাকে কৃষকরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি গাইবান্ধা
প্রকাশিত: ০৩:০৯ পিএম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

চলতি বছর গাইবান্ধায় দ্বিতীয় দফা বন্যার পর ধানের চারার দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে বন্যা কবলিত এলাকার কৃষকরা ধানের চারা কিনতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। এবার ফসল ফলিয়ে লাভবান হওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছেন কৃষকরা।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর দ্বিতীয় দফা বন্যায় গাইবান্ধার সাত উপজেলায় ১৫১ হেক্টর জমির আমন বীজতলা ও ২৬ হাজার ১৬৫ হেক্টর জমির রোপা আমন ধান নষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা প্রায় পৌনে দুই লাখ। ক্ষতিগ্রস্ত এসব কৃষকদের মধ্যে ১৫০ জন কৃষকের মাঝে ধানবীজ ও ৬০০ জনের মাঝে ধানের চারা বিতরণ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার বিকেলে গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে সাদুল্লাপুর উপজেলা শহরের সাদুল্লাপুর বহুমুখী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ হাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামগুলো থেকে নছিমন, বাইসাইকেল ও রিকশা-ভ্যানে করে গুটি স্বর্ণা, মামুন স্বর্ণা ও তিলকাপুর (চিকন) ধানের চারা নিয়ে আসা হচ্ছে হাটে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরাও এই হাটে আসছেন ধানের চারা কেনার জন্য। প্রতি পোন (২০ গোন্ডা) চারা ৫৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ বন্যার আগে বিক্রি করা হতো মাত্র ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায়। প্রতি মঙ্গলবার ও শুক্রবার হাট বসে এখানে। এছাড়াও এই হাটে ধানের চারা বিক্রি করা হয় প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।

এই হাটে ধানের চারা কিনতে আসা সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের বদলাগাড়ী গ্রামের আশরাফুল ইসলাম (৩২) বলেন, বসতভিটা ছাড়া নিজের কোনো আবাদি জমি নাই আমার। এবার ৪০ শতক জমি বর্গা নিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা খরচ করে জমিতে আমন ধানের চারা লাগিয়েছিলাম। কিন্তু বন্যার পানি ঢুকে সব চারা নষ্ট হয়ে গেছে। আমি সামান্য রিকশা-ভ্যান চালাই। বাবা-মা, স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েসহ ছয় সদস্যের সংসার চালাতে এমনিতেই কষ্ট হচ্ছে। এরপর আবার বেশি দামে হাট থেকে ধানের চারা কিনতে হচ্ছে।

gaibandha1

একই ইউনিয়নের সালাইপুর গ্রামের আশরাফুল মিয়া (২৮) বলেন, প্রায় ১১ হাজার টাকা খরচ করে তিন বিঘা জমিতে ধানের চারা রোপণ করেছিলাম। কিন্তু বন্যায় সব নষ্ট হয়ে গেছে। এখন ৯ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে হাটে এসেছি ধানের চারা কেনার জন্য। কিন্তু হাটে এসে দেখছি ধানের চারার দাম দ্বিগুণ।

একই উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের শ্রীকলা গ্রামের হাফিজার প্রধান (৬০) বলেন, জমানো টাকা দিয়ে এবার আমার আড়াই বিঘা জমিতে আমন ধানের চারা রোপণ করেছিলাম। বন্যায় পানিতে তলিয়ে থেকে সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এবার আর হাতে কোন টাকা-পয়সা নেই। তাই ২০ হাজার টাকায় একটি বাছুর বিক্রি করে ধানের চারা কিনতে এসেছি। এ ছাড়া বন্যায় আমার মেয়েরও দেড় বিঘা জমির ধান তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন বেশি দামে ধানের চারা কিনতে হচ্ছে।

হাটে ধানের চারা বিক্রি করতে আসা সাদুল্লাপুর উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের বুজরুক জামালপুর গ্রামের শহীদুল ইসলাম বলেন, এবার ২০ শতক জমিতে চারা উৎপাদন করে ছয় বিঘা জমিতে লাগিয়েছি। এরপর আড়াই পোন ধানের চারা বেশি হয়েছে। তাই সেগুলো বিক্রি করতে হাটে এসেছি। এখানে প্রতি পোন ধানের চারা বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৭৫০ টাকায়।

gaibandha1

একই উপজেলার কামারপাড়া ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের বিনয় কৃষ্ণ (৫৮) বলেন, আট শতক জমিতে চারা উৎপাদন করে আড়াই বিঘা জমিতে রোপন করে তিন পোন চারা বেশি হয়েছে। তাই হাটে এসেছি এগুলো বিক্রি করতে। আকারভেদে এক বিঘা জমিতে রোপণ করতে তিন থেকে পাঁচ পোন ধানের চারার প্রয়োজন হয়। বন্যার কারণে অনেক ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ধানের চারার দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই হাটের ইজারাদার মো. আল-আমিন মিয়া বলেন, বন্যার্ত এলাকার মানুষরা যাতে সহজে ধানের চারা পায় সেজন্য প্রতিদিন এখানে হাট বসছে। এখানে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে ধানের চারা কিনতে।

এসব বিষয়ে গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আ কা মো. রুহুল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে ধানের চারা বিতরণ অব্যাহত আছে। এ পর্যন্ত জেলায় ১৫০ জন কৃষকের মাঝে ধানবীজ ও ৬০০ জন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের মাঝে ধানের চারা বিতরণ করা হয়েছে।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা প্রায় পৌনে দুই লাখ হলেও মাত্র ৭৫০ জন কৃষককে সহায়তা দেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি রংপুর বিভাগীয় কৃষি সম্পাসারণ অধিদফরকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা জানিয়েছি। এতে যা বরাদ্দ পেয়েছি, তাই বিতরণ করেছি।

রওশন আলম পাপুল/আরএআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।