টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে গতি ফিরবে পাহাড়ের পর্যটনে
একটি দেশের জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম খাত পর্যটন। বিশ্বব্যাপী এটি জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। ‘টেকসই পর্যটন : উন্নয়নের হাতিয়ার’ এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পর্যটন দিবস। সারা দেশের ন্যায় খাগড়াছড়িতেও দিবসটি পালনের উদ্যোগ নিয়েছে পর্যটনের স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে পরিচিত ‘খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ’। পাহাড়ে পর্যটন দিবসের আয়োজনে আড়ম্বরতা থাকলেও গতি নেই এখানকার স্থানীয় পর্যটনে।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা থাকলেও অবকাঠামো, নিরাপত্তাহীনতা, অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অগ্রগতি নেই পাহাড়ের পর্যটনে। নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও সাফল্যের মুখ দেখছে না সম্ভাবনাময় এ খাতটি। সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ের পর্যটনকে ঘিরে পর্যটন পিপাসু মানুষের আর্কষণ বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি পর্যটকদের নিরাপত্তাসহ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক পর্যটকই এখানে আসার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নয়।
সরকারি উদ্যোগের কমতি থাকলেও বেসরকারি উদ্যোগে পাহাড়ের বিভিন্ন পর্যটন স্পট কেন্দ্রিক কিছু হোটেল-কটেজ গড়ে উঠছে। ফলে পর্যটনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর উপর। তবে অনেকের মতে পর্যটনের এই নাজুক পরিস্থিতির জন্য মূলত পাহাড়ের পর্যটনের স্থানীয় অভিভাবক পার্বত্য জেলা পরিষদের সমন্বয়হীনতাই দায়ী।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর পাহাড়ে তুলনামূলক স্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজমান। শান্তিচুক্তির পর ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও পর্যটনের সুফল ঘরে তুলতে পারছে না স্থানীয়রা। সরকার এই খাত থেকে খুব বেশি লাভের মুখ দেখছে না। এ খাতকে কেন্দ্র করে পর্যটনের উন্নয়নেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক পর্যটনের বিশাল আয়তন থাকলেও দীর্ঘ সময়ে তা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারেনি। একইসঙ্গে পর্যটন কেন্দ্রিক উদ্যোগে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে যুক্ত করতে না পারায়,পর্যটন নিয়ে স্থানীয়দেও মাঝে নেতিবাচক ধারণা আছে। পর্যটনের উন্নয়নে পাহাড়ের স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে যুক্ত করারও দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
বর্তমানে পর্যটনের ধারণা আর্ন্তজাতিক। প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ পর্যটক এদেশে বেড়াতে আসলেও তার যৎ সামান্য আসে পার্বত্য চট্টগ্রামে। নিরাপত্তার কড়াকড়ির কারণে বেশির ভাগ বিদেশি পর্যটক পাহাড় বিমুখ। বিদেশি পর্যটক না আসায় মানসম্মত হোটেল রির্সোট গড়ে উঠেনি এখানে। কক্সবাজার কিংবা সুন্দরবনকে ঘিরে বিদেশি পর্যটকদের মাঝে আর্কষণ গড়ে উঠলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিজ্ঞতা সুখকর নয় তাদের কাছে।
খাগড়াছড়ির আলুটিলা সুড়ঙ্গ কিংবা রিছাং ঝর্ণায় পর্যটকদের যাতায়াত বাড়লেও সেখানে আগত পর্যটকদের জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো অবকাঠামো। নামমাত্র দু‘একটি শৌচাগার থাকলেও তা পর্যটকদের জন্য মানসম্মত নয়। সেখানে নেই ড্রেসিং রুম বা পানির পর্যাপ্ত সুবিধা।
খাগড়াছড়ির আলুটিলা সুড়ঙ্গ ও রিছাং ঝর্ণাকে ঘিরে বিশাল এলাকায় ‘ইকো ট্যুরিজম জোন’ গড়ে তোলা হলে শুধুমাত্র পাহাড়ের পর্যটন শিল্পেরই বিকাশ হবে না পাহাড়ের পর্যটনকে ঘিরে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়বে বলে মনে করেন পাহাড়ের সচেতন মহল। তাদের মতে ‘ইকো ট্যুরিজম জোন’ পাহাড়ের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।

জানা যায়, পার্বত্য শান্তিচুক্তি অনুযায়ী প্রায় ২৩টি খাত পার্বত্য জেলা পরিষদের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। পর্যটন খাত এগুলোর মধ্যে অন্যতম। পর্যটন নিয়ে কার্যকরী উদ্যোগের অভাবে সম্ভাবনাময় এই খাতটি মুখ থুবড়ে পড়ছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে এখানে পর্যটকদের অবাধ যাতায়াত কম। সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হয় এ খাত। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটিসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে এই খাতের ব্যবসায়ীরা ব্যাপক লোকসানেরও শিকার হয়।
পাহাড়ের পর্যটন শিল্পের বিকাশে নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানিয়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী বলেন, পর্যটন শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে সবার আগে দরকার ‘স্থায়ী এবং টেকসই উন্নয়ন’। তার মতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে এই খাতে ব্যাপক সুফল পাবে পাহাড়ের স্থানীয় মানুষও।
মুজিবুর রহমান ভুইয়া/এফএ/এমএস