কৃষকলীগ নেতার অত্যাচারে কাঁদছেন কৃষকরা
গভীর নলকূপের সেচের পানি দিয়ে বোরো ধান আবাদে রাজি না হওয়ায় সেচের পানি দিয়ে চাষিদের বপণ করা অর্ধশত বিঘা জমির বীজ নষ্ট করে দিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান ও কৃষক লীগ নেতা।
প্রভাবশালী ও পুলিশের ভয়ে চলতি রবি মৌসুমে কৃষকরা এ মাঠে ফসল আবাদ না করার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন। ফলে মাঠের প্রায় ৪শ’ বিঘা জমিতে রবি মৌসুমে ফসল আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আদালতের আদেশ উপেক্ষা করে কৃষকের জমি জবর দখল করে চেয়ারম্যান গভীর নলকূপ বসিয়েছেন।
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার গোপগ্রাম ইউনিয়নের গোপগ্রাম দক্ষিণপাড়া, আড়ুয়াপাড়া, মুরারীপুর ও বরইচারা গ্রামের খুলার মাঠের ৪শ’ বিঘা জমি রবি ও চৈতালি ফসল আবাদের জন্য বিশেষ উপযোগী বলে কৃষকরা জানান।
রবি ফসল আবাদ মৌসুমের শুরুতে কৃষকরা প্রায় অর্ধশত বিঘা জমিতে খেসারি ও মটরের বীজ বপণ করেন। গোপগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন ওরফে আলম প্রামানিক ক্ষমতার দাপটে একক সিদ্ধান্তে অন্যের জমি দখল করে মাঠের পশ্চিম প্রান্তে আবাসিক এলাকায় বিদ্যুৎচালিত গভীর নলকূপ স্থাপন করেন।
আসন্ন মৌসুমে মাঠটিতে বোরো ধান আবাদের জন্য কৃষকদের ওপর চাপ দেয়া হয়। কৃষকরা রাজি না হওয়ার একপর্যায়ে বীজ বপণ করা জমিতে সেচের পানি দিয়ে ভাসিয়ে দেয়া হয়।
এতে ডাল, খেসারি ও মটরের অঙ্কুরিত বীজ পচে নষ্ট হয়ে যায়। এ ঘটনার পর কৃষকরা একটি গণআবেদন থানা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন বরারব জমা দেন। কিন্তু প্রভাবশালী চেয়ারম্যান ও কৃষকলীগের নেতার বিরুদ্ধে থানা পুলিশ গণআবেদনটি গ্রহণ করেনি বলে কৃষকরা অভিযোগ করেন। সেই সঙ্গে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেক কৃষক।
এরপর ক্ষিপ্ত হয়ে চেয়ারম্যানের সমর্থকরা কৃষকদের ওপর দুই দফায় হামলা চালায়। নতুন করে প্রভাবশালীদের হামলা ও মামলার ভয়ে কৃষকরা মাঠে রবি ফসল আবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না। তাই তারা এ মৌসুমে ফসল আবাদ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ইউপি চেয়ারম্যান ও কৃষকলীগ নেতা গোপগ্রাম মৌজার আরএস ২৭২৭ নম্বর দাগের যে জমিতে গভীর নলকূপটি বসিয়েছেন তার মালিকানা দাবি করেন কৃষক হোসেন আলী প্রামানিক।
তার দাবি ৩ পুরুষ ধরে তারা এ জমির মালিক। জমি তার নিজের দখলে আছে। কিন্তু চেয়ারম্যান রাতারাতি তার বাহিনী দিয়ে জমি দখল নিয়ে গভীর নলকূপ বসিয়েছেন। কৃষকদের দায়ের করা মামলায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কুষ্টিয়ার আদালত স্থিতি অবস্থা বজায় রাখার জন্য খোকসা থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন।

কিন্তু আদালতের নির্দেশের তোয়াক্কা না করে চেয়ারম্যান ইতোমধ্যে সেই জমিতে গভীর নলকূপটি স্থাপন করেছেন। আবার সেই মেশিনের সেচের পানি দিয়ে শতাধিক কৃষকের জমিতে বপন করা রবি ফসলের বীজ নষ্ট করে দিয়েছেন।
রোববার সকালে সরেজমিন খুলার মাঠে গিয়ে কথা হয় ঝন্টু, শহিদুল, শাজাহান, মসলেম, নাসির, আক্কাস, আব্দুল, আব্দুল্লাহ, কৃষাণী তাসলিমা, রেবা, আদুরিসহ অনেক কৃষকের সঙ্গে।
তারা অভিযোগ করেন, চেয়ারম্যানের অন্যায় নির্দেশ অমান্য করে জমিতে রবি ফসলে বীজ বপণ করেন কৃষকরা। কিন্তু চেয়ারম্যান জোর করে রাতারাতি সেচের পানি দিয়ে সে বীজ নষ্টকরে দেন। কৃষকরা প্রতিবাদ করায় চেয়ারম্যানের সমর্থকরা তাদের ওপর দুই দফায় হামলা করেছেন। পুলিশকে ম্যানেজ করে কৃষকদের নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে হেনস্তা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কৃষক আছামদ্দিনের পকেটে গাঁজা দিয়ে কোর্টে চালান দেয়া হয়েছে বলেও কেঁদে ফেলেন কৃষকরা।
কৃষকরা বলেন, চেয়ারম্যান ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কৃষক হোসেন আলীর জমি দখল করে গভীর নলকূপ বসিয়েছেন। প্রভাবশালীদের অব্যাহত চাপ ও পুলিশ প্রশাসনের একচোখা আচরণে চলতি রবি মৌসুমে এ মাঠের জমি আবাদ করব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা।
তাদের ভাষ্য, এক মৌসুম আবাদ না হলে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। এছাড়া মাঠটি পদ্মানদীর পাশে হওয়ায় বোরো ধান আবাদ মৌসুমে গভীর নলকূপের লেয়ার ফেল করে। ফলে ধান আবাদ বাধাগ্রস্ত হয়।
দখল হয়ে যাওয়া জমির আইলে দাঁড়িয়ে কৃষক হোসেন আলী বলেন, এ জমি আমার তিন পুরুষের। চেয়ারম্যান আলম প্রামানিক জমি দখল করে নেবে এমন খবর পেয়ে থানায় যাই। কিন্তু পুলিশ আমার কথা শুনেনি। পরে আদালত থেকে স্থিতি অবস্থার জন্য আদেশ এনে দেই। কিন্তু পুলিশ সে আদেশও আমলে নেয়নি। ইতোমধ্যে আমার জমিতে গভীর নলকূপ স্থাপন হয়ে গেছে- বলে কেঁদে ফেলেন এ কৃষক।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান ও কৃষকলীগ নেতা আলমগীর হোসেন ওরফে আলম প্রামানিক বলেন, প্রায় ২ যুগ আগে খাস জমিতে গভীর নলকূপটি স্থাপন করা হয়। মধ্যে কিছু দিন বন্ধ ছিল। সেটি আবার জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা হয়েছে। এছাড়া সাধারণ কৃষকরা গভীর নলকূপের সেচের পানি নিতে আগ্রহী বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে, খোকসা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হুদা কৃষকদের গণআবেদন গ্রহণ করেননি বলে স্বীকার করেন। তবে আদালতের নির্দেশ জারি করা হয়েছে এবং বলবৎ আছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিষ্ণু পদ সাহা বলেন, কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ আমার জানা নেই। তবে কৃষকদের সঙ্গে গভীর নলকূপের পানি দেয়া নিয়ে চেয়ারম্যানের বিরোধের কথা শুনেছি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিনা বানু বলেন, বিষয়টি চেয়ারম্যান আর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানেন। আমি এর কিছুই জানি না।
আল-মামুন সাগর/এএম/জেআইএম