বরেন্দ্রে তিন টাকায় মাসজুড়ে পানি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ
প্রকাশিত: ০১:৫৯ এএম, ১৭ জানুয়ারি ২০১৮

নওগাঁ জেলার বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত সাপাহার, পোরশা, নিয়ামতপুর উপজেলা। এছাড়া পত্নীতলা ও ধামইরহাট উপজেলার আংশিক বরেন্দ্র এলাকা হিসেবে পরিচিতি। খরাপীড়িত এসব অঞ্চলের দৈনন্দিন কাজে মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল পুকুর এবং কূপের পানি। চৈত্র-বৈশাখ মাসে তা আবার ফুরিয়ে যায়। শুরু হয় পানির জন্য দুর্ভোগ।

গত বছরের জানুয়ারি থেকে ‘কমিউনিটি পানি সরবরাহ প্রকল্প’ এসব অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হয়েছে। এটি এখন এলাকাবাসীর কাছে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো আশার আলো ছড়াচ্ছে। লাঘব হয়েছে পানি সংগ্রহের কষ্ট। এখন বাড়ির উঠানে তিন টাকায় মাসজুড়ে অনায়াসে বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছে এলাকাবাসীরা।

জানা গেছে, বরেন্দ্র ভূমি এসব এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আড়াইশ থেকে ৩শ ফুট গভীর। সাধারণ নলকূপ দিয়ে বর্ষাকালে পানি পাওয়া যায়। কিন্তু চৈত্র-বৈশাখে পানি থাকে না। তখন পানি সংগ্রহে যুদ্ধ নামতে হয় এসব এলাকার মানুষদের। পানি সংগ্রহে নারী-পুরুষদের ছুটতে হতো গ্রাম থেকে প্রায় দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরে গভীর নলকূপের দিকে। কোথাও বড়দিঘি অথবা পুকুর থেকে। ফলে পানি সংগ্রহেই চলে যেত দিনের অর্ধবেলা। আবার কখনো বাধ্য হয়ে এলাকার ডোবা-নালার পানি ব্যবহার করতে হয়। এতে করে পানিবাহিত নানা রোগের প্রকোপও ছিল বরেন্দ্র এলাকার যত্রতত্র।

nn

গত বছর জানুয়ারিতে স্থানীয় এমপি সাধনচন্দ্র মজুমদারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপন করা হয় ‘কমিউিনিটি বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ প্রকল্প’। এতে উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, এলজিইডি বিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অর্থায়নে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয়ে গ্রামে গ্রামে সাবমারসিবল মোটরের সাহায্যে প্লাস্টিকের ট্যাংকি উচুস্থানে স্থাপন করে পাইপলাইনে ট্যাপকল বসিয়ে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এমনকি পাইপ লাইনের মাধ্যমে বাড়ির উঠানেও পানি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই সরবরাহে শুধু বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। বাড়তি কোনো অর্থ পানির জন্য দিতে হয় না। পরিবারের সদস্য সংখ্যা অনুয়ায়ী প্রতিজন সদস্যের জন্য মাসে তিন থেকে চার টাকা করে খরচ পড়ছে। প্রাথমিক অবস্থায় জেলার সাপাহার উপজেলার ৫০টি গ্রামে এই প্রকল্প চালু করা হয়েছে। আরও ১০০টি প্রকল্প চালু করা হবে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

উপজেলার কাবুলপাড়া, তুড়িপাড়া, তাজপুর পূর্বপাড়া, তেহরিয়া, খোট্টাপাড়া, মানিকুড়া, দিঘিপাড়া, কল্যাণপুর, মালিপুর, বড়ডাঙ্গা, ভিকনা ও ইসলামপুরসহ পানি সরবরাহ প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকার মানুষ এখন অনায়াসে বিশুদ্ধ খাবার পানি পাচ্ছে। ট্যাংকির নিচে প্রধান ট্যাপকল থেকে গ্রামের গৃহবধূরা পানি সংগ্রহ করছে, কেহ বাড়ির উঠানেই ট্যাপকলেই পানি নিচ্ছে।

সাপাহার উপজেলার খোট্টাপাড়া গ্রামের বয়জ্যেষ্ঠ মনজুর হোসেন বলেন, বছরের বেশির ভাগ সময় পুকুর ও ডোবার পানি ব্যবহার করতো হয়েছে। শত বছরের এই প্রাচীন দুর্ভোগ বাব-দাদাসহ আমাদের কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। এক সময় বিশুদ্ধ পানির অভাবে গ্রামে গ্রামে কলেরা, ডায়রিয়া, বসন্তে অনেক লোক মারা গেছে। এখন আমরা বিশুদ্ধ পানি পাচ্ছি। শুধু খাবারই না, রবি ফসলের আবাদেও এই পানি ব্যবহার করা হচ্ছে।

nn

দিঘিপাড়া গ্রামের আছিয়া বিবি বলেন, খরা মৌসুমে প্রতিদিন ২-৩ কিলোমিটার দূর থেকে খাবারের জন্য পানি সংগ্রহ করতে হতো। এতে করে দিনের অর্ধেক সময় শেষ হয়ে যেত। কিন্তু এখন বাড়ির উঠানেই পানি পাচ্ছি। আর জনপ্রতি সারামাসে তিন টাকা করে দিতে হয়।

সাপাহার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শামসুল আলম শাহ চৌধুরী বলেন, স্থানীয় এমপি সাধনচন্দ্র মজুমদারের উদ্যোগে এই প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পে সাড়ে ৪’শ ফিট পর্যন্ত গভীরে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন মোটর বসিয়ে উচু টাংকির মাধ্যমে পানি সরববরাহ হচ্ছে। যার সুবিধা পাচ্ছে এলাকাবাসী। আগামীতে আরও স্থাপন করা হবে।

আব্বাস আলী/বিএ

আপনার মতামত লিখুন :