ট্রাফিক ইন্সপেক্টরের চোখ শুধু মোটরসাইকেলের দিকে

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ১০:৪৯ এএম, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
ফাইল ছবি

কুড়িগ্রাম ট্রাফিক বিভাগে চলছে হযবরল অবস্থা। অনিয়ম-দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বছরে অবৈধ ভাবে শুধু ট্রাফিক বিভাগের আয় প্রায় আড়াই কোটি টাকা। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে চলছে মোটরসাইকেলে জরিমানার নামে হয়রানি। যা একেবারে জুলুমের পর্যায়ে ঠেকেছে সাধারণ মানুষের কাছে। আর এ সুযোগে প্রতি বছর এক কোটি ৪৪ হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কুড়িগ্রামের ট্রাফিক বিভাগের ইন্সপেক্টর প্রশাসন ওয়াজ নবী এবং তার বিশেষ টিম।

ওয়াজ নবীর অপকর্মের অন্যতম সহযোগী টিএসআই আমিরুল ও এটিএসআই হারুন। ৫-৬ জনের একটি বিশেষ টিম মাসের ২৩-২৪ দিন বিভিন্ন উপজেলায় অভিযানের নেমে শুধুমাত্র মোটরসাইকেল আটক করে। রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্ত গাড়িও আটক করা হয়। আর রেজিস্ট্রেশন না থাকলে তো কথাই নেই। সবার জরিমানা ৪ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ জরিমানর সিংহভাগ টাকা যায় টিআই ওয়াজ নবীর পকেটে।

ভেহিকেল অ্যাক্টের আওতায় পড়ে না এমন বাহন যেমন ভটভটি, পাওয়ার টিলার, ট্রলি, ব্যাটারিচালিত অটো রিকশা চলছে দেদারছে। সব মিলিয়ে কুড়িগ্রাম শহর এখন যানযটের শহরে পরিণত হয়েছে। শহরের ব্যস্ততম সড়কে নেই ট্রাফিক বিভাগের চোখে পড়ার মতো কোনো উদ্যোগ। সাধারণ মানুষের জীবনযাপন যখন বিপর্যস্ত তখন টিআই ওয়াজ নবীর বাহিনী দিন-রাত ব্যস্ত মোটরসাইকেলের মামলা আর জরিমানার টাকার ছয়নয় নিয়ে।

অফিস সূত্রে জানা যায়, কুড়িগ্রাম ট্রাফিক বিভাগে লোকবল ৪১ জন। এরমধ্যে টিআই (ট্রাফিক ইন্সপেক্টর) পদে ৫ জন। ২ জন ঢাকা হেড-কোয়ার্টারে সংযুক্ত অপর তিনজন কুড়িগ্রামে কর্মরত। এছাড়া সার্জেন্ট ২ জন, টিএসআই ৩ জন, এটিএসআই ৯ জন এবং কনস্টেবল ২২ জন।

দাফতরিক সঠিক কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও গড়ে প্রতিদিন ৩০-৩৫টি মামলা হয় মোটরসাইকেলের। বাড়ির উঠান থেকেও মোটরসাইকেল ধরে আনার রেকর্ড রয়েছে। নম্বর প্লেট থাকলেও সর্বোচ্চ জরিমানা গুনতে হয়। রাজনৈতিক তদবিরে অনেক ক্ষেত্রে টাকার অংক ৫০০-১০০০ টাকা কমলেও বাকি টাকা রশিদ ছাড়াই গ্রহণ করেন টিআই ওয়াজ নবী। অধিকাংশ মামলার জরিমানার টাকা তিনি পকেটস্থ করেন। আর স্বল্প পরিমাণ টাকা জমা হয় সরকারি কোষাগারে।

এ হিসাবে মাসে তিনি শুধুমাত্র মোটরসাইকেলের মামলা সংক্রান্ত জরিমানা থেকে বাড়তি আয় করেন কমপক্ষে ১২ লাখ টাকা। অর্থাৎ বছরে প্রায় এক কোটি ৪৪ লাখ টাকার বাণিজ্য হয় মোটরসাইকেল মামলা সংক্রান্ত খাত থেকে। এ দু’খাত মিলে বছরে ট্রাফিক বিভাগের অবৈধ আয় দাঁড়ায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা।

অভিযোগে জানা যায়, গত বছর ২২ জুন রাজারহাটে ট্রাফিক পুলিশের এক টিএসআইয়ের ধাওয়া খেয়ে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে জয়নাল আবেদীন নামে এক কলেজছাত্রের মৃত্যু হয়। রাজারহাট-তিস্তা সড়কের মন্ডলের বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ জনতা তিন ঘণ্টা রাস্তা অবরোধ করে ট্রাফিক পুলিশের বিচার দাবি করে। পরে প্রশাসন ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিলে অবরোধ তুলে নেয়া হয়।

স্থানীয় লিয়াকত আলী বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশ এখনও ওই স্পটে এসে গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষার নামে ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় এত বাহন থাকলেও পুলিশের চোখ শুধু মোটরসাইকেলের উপর। এখন মনে হয় মোটরসাইকেলের মালিক মানে পাপিষ্ঠ ব্যক্তি। রাস্তায় নামলেই অপদস্তের শিকার হতে হয়।’

একই রকম অভিযোগ চিলমারী প্রেস ক্লাবের সভাপতি নজরুল ইসলাম সাবুর। এক সপ্তাহের ব্যবধানে একই গাড়িতে ২ বার মামলা দেয় পুলিশ। ৫ হাজার টাকা করে দাবি করলেও দু’দফায় ৩ হাজার টাকা দিয়ে ম্যানেজ করতে হয় টিআই ওয়াজ নবীকে। তবে টাকা নেয়ার রশিদ কোনোবারই দেয়া হয়নি।

তবে ওয়াজ নবী তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অন্যান্য জেলায় যে ভাবে চলে এখানেও সে ভাবে চলছে। আর আমি তো একা নই যা করি সবাই মিলে করতে হয়।

নাজমুল হোসেন/এফএ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :