পায়ের গন্ধে স্কুলে কেউ কাছে বসে না, তাই যাই না

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মাদারীপুর
প্রকাশিত: ০৮:৩৮ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

বিরল রোগে আক্রান্ত মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার ১৩ বছরের কিশোর আব্বাস শেখ। তার ডান পা ফুলে বিশালাকৃতির হয়েছে। এতে করে সে চলাফেরা করতে পারছে না। সেই সঙ্গে প্রতিনিয়ত সেই পা দিয়ে বের হচ্ছে এক ধরনের রস। এছাড়াও তার সারা শরীরজুড়ে উঠেছে আচিল। সব মিলে করুণ যন্ত্রণায় দিন কাটছে এ কিশোরের।

অনেক দিন আগে তাকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায় তার বাবা। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দিলে টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় ছেলেকে নিয়ে বাড়ি চলে আসেন রাজ্জাক শেখ।

তিনি জানান, জম্মের পর তার ডান পা-টি একটু স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তেমন বোঝা যেত না। ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করা অবস্থায় হঠাৎ ফুলে যেতে শুরু করে তার পা। এরপর সেখান থেকে বের হতে শুরু করে এক ধরনের রস। আর আস্তে আস্তে বড় হতে শুরু করে পা। এরপর শরীরজুড়ে উঠতে শুরু করে আচিল। মাঝে মধ্যে পায়ের ব্যথা বেশি হলে এলাকার দোকান থেকে ওষুধ এনে খাওয়ানো হয়।

madaripur

রাজৈর পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের আলম দস্তার গ্রামের রং মিস্ত্রি আ. রাজ্জাক শেখের ২ সন্তান ও এক বোন জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। ৪০ বছর বয়সী বোন ইসমত আরা শারীরিক ও বাক প্রতিবন্ধী। বিছানাতেই কেটে যাচ্ছে তার দিনকাল। ২৪ বছর বয়সী বড় মেয়ে শারমিন আক্তারেরও একই দশা। তারও জীবন কেটে যাচ্ছে বিছানার উপর। একই সমস্যায় ৩ বছর আগে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে ১৭ বছর বয়সী ছোট মেয়ে আদুরী আক্তার।

একমাত্র ছেলের চিকিৎসা করাতে ইতোমধ্যে জমি-জায়গা বিক্রি করলেও কোনো ফল পাওয়া পাননি তিনি। চোখের সামনে পরিবারটির তিনজন মানুষের করুণ দশা দেখেও যেন কিছুই করার নেই অসহায় রাজ্জাক শেখে। কারণ অভাবে করাল গ্রাসে তারা এখন নিঃস্ব।

আব্বাসের মা আল্পনা বেগম বলেন, ঘরে তিনটি মানুষ মরণ ব্যধিতে আক্রান্ত। আমার স্বামী রং মিস্ত্রির কাজ করে সংসার চালাতে হিমশিম খায়। ওদের চিকিৎসার জন্য জমিজমা বিক্রি করছি, অনেক টাকা ধারও করছি। এখন শুধু এ বাড়িটুকুই আছে। আমরা এহন কী করুম জানি না।

madaripur

কিশোর আব্বাস শেখ জানায়, আমার পা দিন দিন ফুলে মোটা হচ্ছে আর সারা শরীরে আচিল বড় হচ্ছে। আবার পা থেকে দুর্গন্ধযুক্ত রস বের হচ্ছে। কেউ কাছে বসতে চায় না। তাই স্কুলেও যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি। আমার অনেক ইচ্ছা হয় লেখাপড়া করার। অন্য সবার মতো খেলাধুলা করার। লেখাপড়া শেখে দেশের জন্য কিছু করার। কিন্তু আমার দিন দিন যে অবস্থা হচ্ছে জানি না আল্লাহ আমার স্বপ্ন পূরণ করবে কি-না। আমার বাঁচতে খুব ইচ্ছা করে।

রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার মণ্ডল বলেন, আব্বাস নামের কিশোরটি যে জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছে এটাকে আসলে এ্যালিফেন্ট ডিজিজ রোগ বলা হয়। তার পা দেখতে অনেকটা হাতির পায়ের মতো। এ রোগটি যদিও জটিল কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বড় হাসপাতালে বিশেষ ধরনের অপারেশন ও ওষুধের মাধ্যমে এর চিকিৎসা সম্ভব। আমি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আব্বাস ও ওদের পরিবারের আরও দুই জনের শারীরিক অবস্থা দেখাবো। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ওদের চিকিৎসার ব্যাপারে কথা বলবো।

রাজৈর পৌরসভার মেয়র শামীম নেওয়াজ মুন্সী বলেন, আব্বাস শেখের পরিবারটি খুবই অসহায়। ওদের তিন জনকে পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। তবে আব্বাসসহ ওদের তিন জনের উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। সরকারিভাবে ওদের উন্নত চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা করা হলে ওরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।

একে এম নাসিরুল হক/এমএএস/আইআই