পঞ্চগড়ের চার সীমান্তে দুই বাংলার মিলনমেলা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি পঞ্চগড়
প্রকাশিত: ০৬:৫৫ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০১৮

বছরের বিশেষ কোনো দিনে ভারত-বাংলাদেশের বাঙালিরা সুযোগ পেলেই মিশে যায় একে অন্যের সঙ্গে। ভৌগোলিক সীমারেখার বেড়াজালে বন্দি হাজার হাজার মানুষ মিলিত হন কাঁটাতারের বেড়ার উভয়পাশে। কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি বিনিময় করেন নানান উপহার সামগ্রী। দীর্ঘদিন পর স্বজনদের কাছে পেয়ে আবেগে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে।

প্রতি বছরের মত এবারও পঞ্চগড়ে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দুই দেশের বাঙালিদের এই মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়। তবে এবারই প্রথম জেলা প্রশাসন, বিজিবি এবং বিএসএফের সমন্বয়ে মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। রোববার সকাল থেকে জেলার তেঁতুলিয়া ও সদর উপজেলার বিভিন্ন সীমান্তে মিলিত হন নারী-শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী বাঙালিরা।

পঞ্চগড় ও নীলফামারী বিজিবি সূত্র জানায়, রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন তেঁতুলিয়া উপজেলার ভুতিপুকুর সীমান্তের মেইন পিলার ৭৩৪ এর ৬ নং সাব পিলার এলাকা থেকে ৪ নং সাব পিলারের ৫০০ গজ, নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের আওতাধীন একই উপজেলার ভারতীয় শুকানী সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪১ এর ৬ নং সাব পিলার সংলগ্ন ৪০০ গজ, মাগুরমারী সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪২ এর ১১ নং সাব পিলার হতে ১২ নং সাব পিলার সংলগ্ন ৩০০ গজ এবং সদর উপজেলার অমরখানা সীমান্তের মেইন পিলার ৭৪৩ এর ৩ নং সাব পিলার হতে মেইন পিলার ৭৪৪ এর ২ নং সাব পিলার পর্যন্ত এক হাজার ৫০০ গজ এলাকা জুড়ে এই মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়। মেলা চলাকালীন এপারে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা এবং ভারতের ওপারে বিএসএফের পাশাপাশি ভারতীয় পুলিশ সদস্যরা আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে দায়িত্ব পালন করেন।

Border-Milon-Mela2

সকাল হতে না হতে মিলন মেলায় পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও টাঙ্গাইল, বগুড়া, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েক হাজার বাঙালি নারী-পুরুষ সীমান্তের কাঁটাতারের কাছে যান। একই সময় ভারতের কুচবিহার, শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ি জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ভারতীয় বাঙালিরা জড়ো হন কাঁটাতারের ওপারে।

দুপুরের মধ্যে কাঁটাতারের উভয় পাশে জড়ো হয় দুই বাংলার লাখো মানুষ। দুই পাশে দুই দেশের নাগরিক হলেও জাতীতে তারা এক। এরা সবাই বাঙালি। একে অন্যের আত্মীয়। দীর্ঘদিন পর কাছের মানুষদের দেখতে পেয়ে তারা ভুলে যান সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া। বেড়ার ফাঁক পেরিয়ে একে অন্যের হাত ধরেন, কথা বলেন।

মিলনমেলায় ঠাকুরগাঁও বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ শামছুল আরেফীন, পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আল হাকিম মো. নওশাদ, নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল কাজী আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘদিন থেকে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এমন মিলন মেলা হলেও পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি এবং নীলফামারী ৫৬ বিজিবির পক্ষ থেকে এবারই প্রথম মেলায় আগতদের মধ্যে সুপেয় খাবার পানি, খাবার স্যালাইন বিতরণসহ প্রাথমিক চিকিৎসা সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়।

Border-Milon-Mela3

ঠাকুরগাঁওয়ের জগন্নাতপুর ইউনিয়নের চন্ডিপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব হর মহন রায় বলেন, ভারতের জলপাইগুড়ি এলাকায় আমার ছোট ভাই প্রহল্লাদ চন্দ্র থাকেন। তাকে দেখার জন্য এসেছি। খবর পেয়ে সেও এসেছে কাঁটাতারের ওপারে। আমাদের দেখা হয়েছে। কথা হয়েছে। প্রতি বছর একবার এভাবেই আমরা দেখা করি।

একই জেলার পীরগঞ্জ এলাকার সিনোতি রানী বলেন, আমরা গরিব মানুষ। পাসপোর্ট ভিসা করে ভারতে যাওয়ার সুযোগ নেই। আমার ভাই সুবোল রায় ছোটবেলায় ভারতে চলে যায়। তাকে দেখতে এখানে এসেছি।

পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আল হাকিম মো. নওশাদ বলেন, এবারই প্রথম জেলা প্রশাসন, বিজিবি এবং বিএসএফের সমন্বয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আগতদের মাঝে আমরা খাবার পানি, খাবার স্যালাইন বিতরণ করছি। এছাড়া মিলন মেলায় বিজিবির পক্ষ থেকে জরুরি স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

সফিকুল আলম/আরএআর/পিআর