তিন সমস্যা ঘিরে ধরেছে হাওরের বোরো চাষিদের
মৌলভীবাজারে বোরো মৌসুমে ধান কাটার উৎসব চলছে, অনেক কৃষক আবার ধান কাটা শেষও করেছেন। তবে ব্লাস্ট রোগের সংক্রমণ, আগাম বন্যার আশঙ্কা ও শ্রমিক সঙ্কটে বিপাকে পড়েছেন বোরো চাষিরা। ভয়, আশঙ্কা আর সঙ্কটে কৃষকের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মৌলভীবাজারের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে চলছে বোরো ফসল ঘরে তোলার আয়োজন। কৃষক মাঠ থেকে ধান কেটে নিয়ে আসছেন, মাড়াই করছেন এবং কৃষাণীরাও ব্যস্ত ধান শুকাতে। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রপাত, ছত্রাকজনিত ব্লাস্ট রোগ ও শ্রমিক সংকটের কারণে দুঃচিন্তার শেষ নেই।
গত বছর বন্যায় ব্যাপক ফসলহানীর পর এবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন জেলার কৃষক পরিবারগুলো। গত বছরের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে এ বছর জেলার হাকালুকি, কাউয় দিঘী, কেওলার হাওরপাড়সহ অন্যান্য অঞ্চলের কৃষকরা বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে চাষ করেন বোরো ধান। তবে এরইমধ্যে পড়েছেন না সঙ্কটে। ধান কাটার আগে যে স্বপ্ন ছিল তা অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে ধান তোলার সঙ্গে সঙ্গে। ব্লাস্টে আক্রান্ত হয়ে অনেক কৃষকের ৫০ ভাগ পর্যন্ত ফসল নষ্ট হয়েছে। সেই সঙ্গে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় রয়েছে বন্যার আশঙ্কা। তার উপর এই বছর জেলা জুড়ে শ্রমিক সঙ্কট। আবার বজ্রপাতের ভয়ে শ্রমিকরা মাঠে যেতে না চাওয়ায় সঙ্কট আরও তিব্র হচ্ছে।

জেলা কৃষি অফিসের তথ্যানুযায়ী, মৌলভীবাজার জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ৫৪ হাজার ১২ হেক্টর জমিতে বোরো ফসলের আবাদ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ হাজার হেক্টর বেশি। জেলার বিভিন্ন হাওরাঞ্চলের দরিদ্র কৃষকরা এবারের বোরো ফসল নিয়ে আশাবাদী হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের আশা ধরে রাখতে পারছেন না। যে পরিমাণ জমি চাষ করেছেন কোথাও কোথাও তার অর্ধেক ব্লাস্টে আক্রান্ত, যার ফলে ফসল অনেক কমে যাবে। ফসল ফলাতে যে খরচ হয়েছে সে টাকাও আসবে না। হাওরের সব ধান এখনও পাকেনি কিন্তু ভয় ও আতঙ্কে কাচা পাকা ধানই কেটে নিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রোদ বৃষ্টি বজ্রপাতকে উপেক্ষা করে তারা সারাদিন হাওরে ধান কেটে নিয়ে আসছেন। সেই ধান মাড়াই দিয়ে গড়ে ২৫ ভাগ ধানে চিটা পাচ্ছেন। ধান কাটার পূর্ব মুহূর্তে ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে ধান নষ্ট হয়েছে বলে তারা জানান।

অন্যদিকে মৌলভীবাজার জেলার সব চেয়ে বড় বোরো ধানের ভাণ্ডার হাকালুকি হাওরে ব্লাস্টের সঙ্গে যোগ হয়েছে বন্যা আতঙ্ক। এ বছর হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া উপজেলা অংশে চার হাজার ৫৮০ হেক্টর, জুড়ী উপজেলায় চার হাজার ৯০০ হেক্টর, বড়লেখা উপজেলায় দুই হাজার ৪৭৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে।
গত বছরের আগাম বন্যায় ফসল হারিয়েছেন হাকালুকি পাড়ের কৃষকরা। এ বছর বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে তবে ব্লাস্ট রোগ ও আবহাওয়া অধিদফতরের বৃষ্টির পূর্বাভাসে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। তার উপর ভারতের মেঘালয়, মিজরাম, ত্রিপুরার আবহাওয়া অফিসের বার্তায় বৃষ্টির পূর্বাভাস দেয়ায় হাকালুকি পাড়ের কৃষকরা চাইছেন যত দ্রুত সম্ভব ফসল কেটে ঘরে তুলতে কিন্তু বৃষ্টি এবং শ্রমিক সঙ্কটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।
মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিফতরের উপপরিচালক মো. শাহাজান জানান, আবহাওয়া কয়েকটা দিন ভালো থাকলেই ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে। ব্লাস্টের অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, কিছু জায়গা থেকে অভিযোগ এসেছিল তবে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়ায় তেমন বড় ক্ষতি হয়নি।
রিপন দে/এফএ/এমএস