ডিজেল সংকটে সেচ পাচ্ছেন না হাওরের চাষিরা, বোরো ফলন নিয়ে শঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কিশোরগঞ্জে ডিজেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন হাওরাঞ্চলের বোরো চাষিরা। ধানের শীষ বের হওয়ার এই মাহেন্দ্রক্ষণে প্রয়োজনীয় সেচ দিতে না পারায় কাঙ্ক্ষিত ফলন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন হাওর এলাকায় খুচরা বাজারে ডিজেল প্রায় উধাও হয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও ফিলিং স্টেশন থেকে প্রয়োজনমতো জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। আগের প্রতি লিটার ১০৫–১১০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা ১২০–১৩০ টাকার মধ্যে পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাধারণত ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত বোরো ধানের মৌসুম চলে। এই সময়ে হাওরের বিস্তীর্ণ জমিতে ধানের গাছ থেকে শীষ বের হতে শুরু করে। সেচের ওপরই নির্ভর করে ধানের ফলন। কিন্তু ডিজেলচালিত সেচ পাম্প চালাতে না পারায় অনেক জমিতে সেচ দেওয়া ব্যাহত হচ্ছে।
করিমগঞ্জ হাওরের কৃষক রুস্তম আলী জানালেন, ধানের জমিতে নিয়মিত সেচ দেওয়াই এখন প্রয়োজন। কিন্তু ফিলিং স্টেশন বা বাজারে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। তবুও প্রয়োজন মতো ডিজেল পাওয়া যায় না। আগের থেকে প্রতি লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে, তাও সঠিক পরিমাণে ডিজেল নেই। দোকানদাররা বলছে, ইরান-আমেরিকার সংঘাতের কারণে তেলের দাম বেড়ে গেছে।
মিঠামইন হাওরের কৃষক সুজন মিয়া মো. শহিদ মিয়া বলেন, সেচ না দিলে ধানের বড় ক্ষতি হবে। বাজারে তেল নেই, ফিলিং স্টেশনও সীমিত দিচ্ছে। এভাবে চললে অনেক জমির ধান নষ্ট হয়ে যাবে। তেলের সঙ্গে সারের দামও বেড়েছে। ধানের দাম না বাড়লে আমরা ঋণ মেটাতে পারব না।

সেচ পাম্প মালিক মোজাম্মেল হক জানান, একটি পাম্প চালাতে প্রতিদিন অনেক ডিজেল লাগে। কিন্তু এখন নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি দেওয়া হচ্ছে না। ফলে সব কৃষকের জমিতে সময়মতো সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সেহাগ মিয়া নামের আরেক কৃষক বলেন, অনেক কৃষক দূরদূরান্তের ফিলিং স্টেশনে গিয়ে ডিজেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, যা সময় ও খরচ দুটোই বাড়াচ্ছে। কৃষকরা সতর্ক করেছেন, ধানের খরচ বেড়ে গেলে যদি বাজারে দাম না বাড়ে, তাহলে তাদের একমাত্র ফসল বোরো ধানও নষ্ট হতে পারে এবং দেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, বোরো মৌসুমে সেচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক ও সেচ পাম্প মালিকরা যাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি পান, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। কোথাও ডিজেল মজুত, অনিয়ম বা অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ১ লাখ ৪ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। সময়মতো সেচ নিশ্চিত করা গেলে ভালো ফলনের আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। তবে জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসকে রাসেল/কেএইচকে/এএসএম