পড়ালেখা করতে না পারায় লাইব্রেরি করেছেন কাঠমিস্ত্রি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ০৯:১১ পিএম, ২৬ মে ২০১৮ | আপডেট: ০৯:১৪ পিএম, ২৬ মে ২০১৮

নিজ অর্থে কমিউনিটি লাইব্রেরি গড়ে তুলেছেন কাঠমিস্ত্রি জসিম উদ্দিন। কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার ৫নং শিমুলিয়া ইউনিয়নের পাইকপাড়া মির্জাপুর গ্রামে তার বাড়ি।

অভাবের কারণে নিজের শিক্ষা জীবন থেমে গিয়েছিল ২য় শ্রেণিতেই। এরপর বড় হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এলাকার মানুষের জন্য কিছু একটা করবেন। তাই ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন কমিউনিটি লাইব্রেরি। এ লাইব্রেরি এখন আলো ছড়াচ্ছে গোটা শিমুলিয়া গ্রামে। এলাকার পিছিয়ে পড়া সব বয়সী মানুষকে বই পড়তে উৎসাহ জোগাতেই জসিমের এই উদ্যোগকে অনেকেই সাধুবাদ জানিয়েছেন।

২য় শ্রেণিতে পড়ার সময় ১০ বছর বয়সেই একদিন হঠাৎ করেই জসিমের বাবা বাড়ি ছাড়েন। আজও ফিরে আসেননি তিনি। বাবা না থাকায় পড়াশোনা আটকে যায় সেখানেই। বাবাহারা জসিম ছোটবেলা থেকেই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন সংসারের ভার। দারিদ্র্যতার কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হতে না পারলেও ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার প্রতি ছিল তার অদম্য আগ্রহ।

আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষটির সামর্থ্য ছিল না বই কিনে পড়ার। তাই সকালেই উপজেলার জানিপুর বাজারের বিভিন্ন দোকানে চলে যেতেন সংবাদপত্র পড়ার জন্য। পাঁচ সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হলেন জসিম। সংসারে রয়েছেন তার মা, স্ত্রী, ৫ বছর বয়সী তার এক কন্যা সন্তান আর শারীরিক প্রতিবন্ধী এক ভাই।

কর্ম জীবন শুরু হয় ১০ বছর বয়সে এক কাঠমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে। সেখান থেকে যা পেতেন তা দিয়েই তাদের সংসার চলতো। জমি বলতে শুধু ভিটে-বাড়িটাই ছিল সম্বল। সব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে ২০১৬ সালের ২৯ অক্টোবর নিজের বসত বাড়ির পাশেই গড়ে তুললেন ‘কমিউনিটি লাইব্রেরি। শত অভাবের মাঝেই তার এই উদ্যোগের সারথী হয়েছেন সহধর্মীণি পপি খাতুন।

পপি বলেন, প্রথম প্রথম খারাপ লাগতো। আমার কাছে মনে হতো পাগলামি। কিন্তু বই পড়ার প্রতি সবার উৎসাহ দেখে তার এই উদ্যোগ ভালো লাগতে শুরু করে।

জসিম জানান, কোনো রকম সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই তিনি নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন তার প্রাণ'র এ পাঠাগারটি। এখন পর্যন্ত তার পাঠাগারে বইয়ের সংগ্রহ প্রায় পাঁচ শতাধিক। সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১২ জনে। তিনি বই কেনেন নিজ খরচে। সদস্যও সংগ্রহ করেন বিনা পয়সায়। ‘কমিউনিটি লাইব্রেরি’র সদস্য হতে কোনো ফি লাগে না। এখানে সদস্যরা নানা রকম বই পড়তে পারেন বিনামূল্যে।

পাঠাগারটিতে বসার জায়গা না থাকার কারণে সবাই বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বই পড়েন। আবার অনেকে বিকেল বেলায় মেঝেতে বসেই বই পড়েন। এলাকার সকল শ্রেণিপেশা ও বয়সের মানুষ তার এই লাইব্রেরির পাঠক।

খোকসা উপজেলা চেয়ারম্যান আলহাজ মো. সদর উদ্দীন খান বলেন, ব্যক্তি উদ্যোগে জসিমের এই কমিউনিটি লাইব্রেরি গড়ে তোলার বিষয়টি সত্যিই প্রশংসনীয়।

স্থানীয় স্কুল শিক্ষিকা ফারজানা পারভীন জানান, জসিমের ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা এই লাইব্রেরির জনপ্রিয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিনিয়ত লাইব্রেরির সদস্য সংখ্যা বাড়ছে। একজন সামান্য কাঠমিস্ত্রি হয়েও জসিম এখন শুধু শিমুলিয়া গ্রাম নয়, গোটা খোকসা উপজেলার একজন আলোচিত মানুষ।

আল-মামুন সাগর/এমএএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :