৫ বছরেও চালু হয়নি মঙ্গলকান্দি হাসপাতাল
ফেনী সদর উপজেলা ও সোনাগাজী উপজেলার মাঝামাঝি স্থানে ৯ ইউনিয়নের মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিতে ৫ বছর আগে নির্মাণ করা হয় ২০ শয্যার একটি হাসপাতাল। ফেনী-সোনাগাজী আঞ্চলিক সড়কের মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের মির্জাপুরে ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৮ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় এ হাসপাতালটির নির্মাণ শেষ হয় ২০১৩ সালে।
দীর্ঘদিন অযত্ন আর অবহেলায় থাকায় বর্তমানে দ্বিতল বিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনটির ভেঙে গেছে দরজা-জানালা। সেই কবেই ঝরে পড়েছে জানালার কাঁচের গ্লাসগুলো। নির্মাণ ক্রুটির কারণে মূল ভবনের কয়েক জায়গায় ফাটলের দেখা দিয়েছে।
প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র বরাদ্ধ না হওয়ায় ৫ বছর পরও এ হাসপাতালটি চালু করা যায়নি। কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে দীর্ঘ সূত্রিতায় স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
ফেনী জেলা সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানায়, সোনাগাজী ও ফেনী সদর উপজেলার মঙ্গলকান্দি, চর মজলিশপুর, বগাদানা, মতিগঞ্জ, চরদরবেশ, আমিরাবাদ, নবাবপুর ও ফেনী সদর উপজেলার ধলিয়া ইউনিয়নের আড়াই লাখ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেয়ার জন্য ২০১১ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয় এ হাসপাতালের। স্বাস্থ্য বিভাগের জমির উপর ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৮ হাজার টাকা ব্যয়ে হাসপাতালটি নির্মাণ কাজ পায় মেসার্স রয়েল অ্যাসোসিয়েট অ্যান্ড দেশ উন্নয়ন লিমিটেড নামের চট্টগ্রামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নির্মাণকাজ শেষে ২০১৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ফেনীর সিভিল সার্জন ও সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরে ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ প্রশাসনিকভাবে হাসপাতালটির বহির্বিভাগে চিকিৎসা শুরুর অনুমোদন দেয়। তবে জনবলকাঠামো অনুমোদন না হওয়ায় হাসপাতালটির আবাসিক কার্যক্রম এখনও চালু হয়নি। বর্তমানে এখানে একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারকে ডেপুটেশনে দিয়ে আউটডোর চালু করা হয়েছে। ওই চিকিৎসক প্রতিদিন গড়ে ৭০-৮০ জন রোগীকে ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন। প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে রোগী দেখেই সময় পার করছেন তিনি। নির্মাণের ৫ বছর পরও এখানে পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু না হওয়ায় জন সাধারণের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের দোতলা ভবনের নিচতলায় চিকিৎসা কর্মকর্তাদের রোগী দেখার আলাদা কক্ষ, পরীক্ষাগার, এক্স-রে কক্ষ, টিকা দানকেন্দ্র, অভ্যর্থনা কক্ষ ও রান্নাঘর রয়েছে। দোতলায় সেবিকা ও চিকিৎসক কক্ষ, পুরুষ ও মহিলা ওয়ার্ড, বিশ্রামাগার, প্রিপারেটরি কক্ষ, প্রসূতি কক্ষ এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অপারেশন থিয়েটার রয়েছে।
ভবনের পাশেই রয়েছে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ দুজন চিকিৎসকের বাসভবন। এছাড়া চিকিৎসক ও সেবিকাদের জন্য ডরমিটরি ভবন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য একটি দোতলা ভবন, পাওয়ার হাউস এবং দোতলা গ্যারেজও নির্মাণ করা হয়েছে হাসপাতালের জন্য।
তবে নির্মাণকাজে ত্রুটির কারণে হাসপাতাল ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। ময়লা-আবর্জনায় ভরা জরাজীর্ণ হাসপাতালের লোহার গ্রিল, নষ্ট হয়ে গেছে দরজা-জানালা, সেই কবেই কাচের গ্লাসগুলো ভেঙে ঝরে পড়েছে। হাসপাতাল এলাকায় নৈশ প্রহরী ও নিরাপত্তা কর্মী না থাকায় অযত্নে অবহেলায় হাসপাতাল ভবন, ডাক্তার কর্মচারীদের বাসাসহ পুরা কমপ্লেক্স এলাকা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেকটা বসবাস অযোগ্য ও অকেজো হয়ে পড়ছে এসব স্থাপনা।
ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গত ২৫ দিন যাবৎ শ্বাসকষ্টসহ কয়েকটি রোগের চিকিৎসা নিচ্ছেন সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের কৃষক আবদুল মান্নান।
তিনি জানান, বাড়ি থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে চিকিৎসা নিতে তার অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এছাড়াও আসা যাওয়ায় খরচ বেশি হওয়ায় আত্মীয়-স্বজনরাও তার খোঁজ-খবর নিতে আসে না। সড়ক দুর্ঘটনা, প্রসূতিকালীন, হৃদরোগ ও অন্যান্য জরুরী সমস্যায় মহাসড়ক ও শহর অতিক্রম করে ফেনী আধুনিক সদর হাসপাতালে রোগী আসতে অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় দেরিতে চিকিৎসা শুরু হওয়ায় রোগীর অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। কখনও কখনও রোগী মারাও যায়। গত ৫ বছর আগে সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে তার বাড়ির কাছে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করলেও আজো সেটি চালু করা হচ্ছে না। এটি চালু হলে তাদের দুর্ভোগ কমতো, বিড়ম্বনা কমতো। কমতো চিকিৎসা ব্যয় ও হয়রানি।
সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুরুল আলম জানান, জনবল ও সরঞ্জামাদি বরাদ্ধ না হলে হাসপাতালটি চালু করা অসম্ভব। বিষয়টি তিনি জেলা সিভিল সার্জনকে বার বার লিখিতভাবে জানানোর পরও কোনো ফল হয়নি বলে জানান।
এমএএস/এমএএস/পিআর