ইফতারে যেখানে শিশুদের মিলনমেলা
জোহরের নামাজের পর থেকেই শুরু হয় ইফতার তৈরির কাজ। দেড় হাজার মানুষের জন্য তৈরি করতে হবে ইফতারের প্যাকেট। যার এক হাজার শিশু-কিশোর।
প্রায় ৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক একসঙ্গে ইফতার তৈরির কাজ করছে। কেউ মুড়ি প্যাকেট করছে তো কেউ সেখানে ছোলা বুন্দিয়া ভরে দিচ্ছে। একপাশ থেকে দেয়া হচ্ছে খেজুর। কেউবা আপেল ভরে দিচ্ছে, আবার কেউ সঙ্গে সঙ্গে প্যাকেটে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন রসালো জিলাপি। পুরো প্যাকেট তৈরির পর আবার একদল প্যাকেট বেঁধে বস্তায় ভরে সাজিয়ে রাখছে। একপাশে থরে থরে বস্তায় প্যাকেট ভর্তি ইফতার সাজিয়ে রাখা হচ্ছে। এভাবেই সবাই ইফতার তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছে।
বলছিলাম নীলফামারীর ডিমলার পশ্চিম খড়িবাড়ি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ইফতার মাহফিলের কথা। প্রায় প্রতি বছর এ ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, প্রায় ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে এ ইফতারের আয়োজন করা হচ্ছে। প্রতি বছর রমজানের শেষ ১০ দিনের যেকোনো একদিন এ ইফতারের আয়োজন করা হয়। এ বছর ২৭ রমজানকে বেছে নেয়া হয়েছে।’

এ ইফতার ঘিরে আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম ও ইউনিয়ন থেকে শিশুসহ দেড় হাজার মানুষের জমায়েত হয়। বিশেষ করে প্রায় প্রতি বছরই হাজারের অধিক শিশু-কিশোরকে এখানে জমায়েত করা হয়।
আনন্দ ও উদ্দীপনা নিয়ে উৎসাহের সঙ্গে শিশুরা এ ইফতার করে। প্রায় প্রতি বছরই শিশুদের জন্য আলাদাভাবে ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি শিশু ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্যই বেশি ইফতার প্যাকেট তৈরি করা হয়েছে। দেড় হাজার মানুষের ইফতার আয়োজনে প্রায় এক হাজারের বেশি শিশুর জন্য আলাদাভাবে ইফতার তৈরি করা হয়।
আসরের নামাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিশু-কিশোরদের জমায়েত শুরু হতে থাকে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসব শিশু-কিশোর জড়ো হয়। একে অপরের মাঝে চলে গল্পগুজব, কথার খুনসুটি। অনেকেই ঈদের আনন্দ খুঁজে পায় এ ইফতারে।

আশপাশের টেপাখড়িবাড়ি, দক্ষিণ খড়িবাড়ি, পূর্ব খড়িবাড়ি, দোহলপাড়া, গাছবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শিশু-কিশোররা জমায়েত হয় এ ইফতারে। ইফতারের সময় থেকে ঘণ্টাখানের আগে সারিবদ্ধভাবে এসব শিশু-কিশোরকে বসিয়ে ইফতারের প্যাকেট হাতে তুলে দেয়া হয়। ইফতার পেয়ে অনেকেই আনন্দ-উদ্দীপনা নিয়ে নিজ নিজ বাড়ি চলে যায়।
ইফতার নিতে আসা একাধিক শিশুর সঙ্গে কথা বলে তাদের আনন্দের কথা জানা যায়।
শিশু-কিশোরদের ইফতার তুলে দেয়ার পর রোজাদাররা একসঙ্গে বসে ইফতার করেন। মসজিদে ইফতারের আগ মুহূর্তে চলে ইসলামিক বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আলোচনা।

ইফতার আয়োজনের দায়িত্বে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদ বলেন, ‘প্রতি বছরের মতো এবারও আমাদের সমাজবাসীর উদ্যোগে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এবার ২৭ রমজানে আমরা এ ইফতারের আয়োজন করছি। প্রায় ১৫০০ মানুষের ইফতারের ব্যবস্থা আমরা করেছি। তার মধ্যে এক হাজারের বেশি শিশুর জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘প্রায় ১৫ বছর থেকে এ ইফতার আয়োজন দেখে আসছি। ছোটবেলা একসময় আমরা শিশুদের মতো বসে ইফতারের প্যাকেট নিতাম। এ রকম আয়োজন আশপাশের আর কোনো জায়গায় করা হয় না। এটি আমাদের গ্রামের একটি ঐতিহ্য।’
ইমরান খান/এনডিএস/জেআইএম