জিবিএস রোগে আক্রান্ত লাখে একজন ঠাকুরগাঁওয়ের হারুন

মাহাবুর আলম সোহাগ
মাহাবুর আলম সোহাগ মাহাবুর আলম সোহাগ , সহকারী বার্তা সম্পাদক (কান্ট্রি ইনচার্জ)
প্রকাশিত: ০৮:০৩ পিএম, ০৬ জুলাই ২০১৯

বিরল রোগে আক্রান্ত ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ২০ বছর বয়সী মোজাইক মিস্ত্রি হারুন অর রশিদ। তার রোগটির নাম গুলেন বারি সিনড্রোম (Guillain-Barre Syndrome) (GBS)।

গুলেন বারি সিনড্রোম একটি বিরল রোগ। প্রতি লাখ মানুষের মধ্য থেকে এক থেকে দুজনের এ রোগ দেখা দেয়। তথ্য উইকিপিডিয়ার।

এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হারুন অর রশিদ এক মাস ১৬ দিন ধরে রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ১ নম্বর ওয়ার্ডের এক নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন। সেখানে ডা. রেজার অধীনে চিকিৎসাধীন তিনি।

এর আগে তিনি রাজধানীর শ্যামলীর ৩ নম্বর রোডে অবস্থিত সিকেডি অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে ২৭ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন। তারও আগে আগারগাঁওয়ে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন হারুন। এসব জায়গায় চিকিৎসা নিতে ইতোমধ্যে তার বাড়ি-ভিটে বিক্রি করতে হয়েছে।

হারুন অর রশিদ বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড় পলাশবাড়ী ইউনিয়নের পলাশবাড়ী গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে হারুন সবার ছোট। পাঁচ বছর ধরে তিনি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মোজাইক মিস্ত্রির কাজ করেছেন।

দুই মাস আগে হাতের আঙুলের ক্ষত থেকে গুলেন বারি সিনড্রোমে (জিবিএস) আক্রান্ত হন হারুন। এরপর থেকে তার চিকিৎসা চালাতে ইতোমধ্যে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে পরিবার। বাড়ি, আবাদি জমি ও শেষ সম্বল ভিটেমাটিও বিক্রি করতে হয়েছে তার চিকিৎসা চালাতে। তবে চিকিৎসকরা আশ্বাস দিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত পরিপূর্ণ চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারলে তাকে বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা চালানোর ক্ষমতা এখন তার পরিবারে আর নেই। এখন মানুষের সহযোগিতা ছাড়া তার চিকিৎসা চালানো সম্ভব না বলে জানিয়েছেন হারুনের চিকিৎসা-সংক্রান্ত তদারকির দায়িত্বে থাকা যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এম এ গফুর। এলাকার সন্তান হওয়ায় তিনি নিয়মিত হারুনের চিকিৎসার খোঁজখবর রাখেন।

এম এ গফুর বলেন, হারুনের পরিবারের যা ছিল ইতোমধ্যে সব বিক্রি করা শেষ। প্রতিদিন আইসিইউতে অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। চিকিৎসক তার বাঁচার ভরসাও দিয়েছেন। কিন্তু এ মুহূর্তে তার চিকিৎসা চালানোর আর কোনো টাকা। কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি পাশে দাঁড়ালে হয়তো তাকে বাঁচানো সম্ভব। জানি না, শেষ পর্যন্ত কি হবে।

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এ রোগে আক্রান্তরা প্যারালাইসিস, প্রান্তীয় স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণকারী অ্যাকিউট বা তীব্র পলিনিউরোপ্যাথি রোগ। ফলে হাত-পা খুব দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। কোনো ইনফেকশনের পর এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি হয়। অনুভূতিতে ভিন্নতা কিংবা ব্যথার পর হাতে এবং পায়ে দুর্বলতা দেখা যায়, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রোগ খুব তীব্র হলে প্রাণঘাতী হতে পারে। তখন কৃত্রিমভাবে শ্বাসকার্য চালানোর জন্য নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। কিছু ব্যক্তির স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রে ডিসঅটোনমিয়া হলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপে গোলযোগ দেখা যায়।

আরও কিছু লক্ষণ রয়েছে। গুলেন বারি সিনড্রোমের প্রথম দিকে অসাড়তা, ব্যথা থাকতে পারে। পরে দেহের উভয় পাশের হাত-পা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্বল হয়ে যায়। এ দুর্বলতা একদিন থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে তীব্র আকার ধারণ করে স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। এ রোগে আক্রান্ত পাঁচজনের মধ্যে একজনের দুর্বলতা চার সপ্তাহ পর্যন্ত অগ্রসর হতে থাকে। ঘাড়ের পেশিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং অনেকেরই কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের অসাড় হয়ে যাওয়ার কারণে মুখের পেশি দুর্বল, খাবার গিলতে অসুবিধা, চোখের পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। ৮ শতাংশের ক্ষেত্রে দুর্বলতা শুধু পায়েই সীমাবদ্ধ থাকে। সব মিলিয়ে গুলেন বারি সিনড্রোমে আক্রান্তদের এক-তৃতীয়াংশ হাঁটতে পারে। এছাড়া শরীরের বিভিন্ন জায়গা যেমন ঘাড়, পিঠ, কোমড় ইত্যাদি জায়গায় ব্যথা থাকতে পারে।

আইসিইউতে হারুনকে দেখভালের দায়িত্বে থাকা তার বোনজামাই আজিজ জানান, শবে বরাতের রাতে হারুন হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানকার ডাক্তারদের পরামর্শে তাকে ঢাকায় এনে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেছে গুলেন বারি সিনড্রোম (জিবিএস) রোগে আক্রান্ত।

তিনি বলেন, কিছুদিন আগেও তার পুরোদমে চিকিৎসা চলছিল। এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। কারণ ইতোমধ্যে সব টাকা শেষ। প্রতিদিন ওষুধ, আইসিইউ বিলসহ তিন হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। আইসিইউ’র ডা. রেজা বলেছেন, আরও কমপক্ষে দুই মাস তাকে সেখানে রাখতে হবে।

আজিজ বলেন, গ্রামের বাড়ির হাঁস-মুরগিসহ এমন কিছু বাকি নেই যা বিক্রি করা হয়নি। সব কিছু বিক্রির টাকা দিয়ে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে হারুনের চিকিৎসায়। আরও যদি দুই মাস এভাবেই চিকিৎসা চালাতে হয় জানি না শেষ পর্যন্ত কত খরচ হবে? কিন্তু আমাদের হাতে কোনো টাকা নেই। কি হবে আল্লাহই জানেন?

বিরল রোগে আক্রান্ত হারুনকে কেউ সহযোগিতা করতে চাইলে তাকে দেখতে যেতে পারেন সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ১ নম্বর ওয়ার্ডের এক নম্বর বেডে। এছাড়া সহযোগিতা পাঠাতে পারেন এম এ গফুর, সঞ্চয়ী হিসাব নং ০৪৫৫০১০০০৬৫৯৮, রূপালী ব্যাংক লি., মোহাম্মদপুর শাখা, ঢাকা। তার ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে যোগাযোগ করতে পারেন হারুনের দুলাভাই আজিজের ০১৭১২ ৮৩৩ ৩৩৫ (বিকাশ) নম্বরে।

এমএএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :