ঘুষের জন্য গৃহবধূকে গণধর্ষণ, প্রত্যাহার হলেও মামলায় নেই এসআই

উপজেলা প্রতিনিধি উপজেলা প্রতিনিধি বেনাপোল (যশোর)
প্রকাশিত: ০৭:০১ পিএম, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

যশোরের শার্শা উপজেলায় দুই সন্তানের জননীকে (৩২) গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) খায়রুলকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় মামলা হলেও এজাহারে নাম নেই এসআই খায়রুলের।

এসআইকে বাদ দিয়ে তিনজনের নাম উল্লেখ করে ও একজনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে মঙ্গলবার রাতে শার্শা থানায় এ মামলা করেন গণধর্ষণের শিকার ওই গৃহবধূ। তবে গৃহবধূর অভিযোগ, গণধর্ষণে জড়িত ছিলেন এসআই খায়রুলও। তবে মামলার এজাহারে কেন এসআই খায়রুলের নাম নেই সে বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি গৃহবধূ।

ইতোমধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশের সোর্সসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনা তদন্তে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সালাহ উদ্দিন শিকদারকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শার্শা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম মশিউর রহমান।

গ্রেফতাররা হলেন শার্শা উপজেলার চটকাপোতা গ্রামের হামিজ উদ্দীনের ছেলে পুলিশের সোর্স কামারুল, লক্ষ্মণপুর গ্রামের মজিদের ছেলে কাদের ও মাজেদের ছেলে লতিফ।

এর আগে মঙ্গলবার যশোর জেনারেল হাসপাতালে সাংবাদিকদের কাছে গৃহবধূ অভিযোগ করেন, শার্শার গোড়পাড়া পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) খায়রুল তার সোর্সদের নিয়ে ঘুষের টাকা না পেয়ে গৃহবধূকে গণধর্ষণ করেছেন।

যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সালাহ উদ্দিন শিকদার বলেন, এ মামলায় অজ্ঞাত আসামিকে গ্রেফতারে পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে। অজ্ঞাত আসামি যেই হোক না কেন তাকে ছাড় দেয়া হবে না।

প্রধান অভিযুক্ত এসআই খায়রুলের নাম কেন মামলার এজাহারে নেই এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহ উদ্দিন শিকদার বলেন, মঙ্গলবার রাতে গৃহবধূর সামনে কয়েক দফায় এসআই খায়রুলকে আনা হয়। খায়রুলকে তখন অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেননি ওই গৃহবধূ।

ভয়ে প্রধান অভিযুক্তের নাম বলতে পারছেন না গৃহবধূ, তাকে কোনো চাপ দেয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সালাহ উদ্দিন বলেন, গৃহবধূকে কোনো ভয়ভীতি দেখানো হয়নি। মঙ্গলবার রাতে যখন এসআই খায়রুলের সামনে গৃহবধূকে আনা হয় তখন তার চোখে-মুখে আতঙ্ক বা ভয়ভীতি ছিল না।

যেহেতু ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় সেহেতু এসআই খায়রুলকে কেন প্রত্যাহার করা হয়েছে- জানতে চাইলে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সালাহ উদ্দিন বলেন, যেহেতু এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তদন্তে যেন নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে সে কারণে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এসআই দোষী সে কারণে প্রত্যাহার হয়েছে এমনটি নয়।

সালাহ উদ্দিন বলেন, যেহেতু এসআইয়ের নামে অভিযোগ করা হয়েছে, তাই কর্মস্থলে কাজ করতে অস্বস্তিবোধ করতে পারেন। তাই তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে তদন্ত কমিটি।

গণধর্ষণের শিকার গৃহবধূ জানান, ২৫ আগস্ট রাতে শার্শার লক্ষ্মণপুরের গ্রামের বাড়ি থেকে তার স্বামী আসাদুজ্জামানকে মাদক ব্যবসার অভিযোগে তুলে নিয়ে যান এসআই খায়রুল। পরদিন তার কাছ থেকে ৫০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার দেখিয়ে আদালতে চালান দেন। সোমবার (২ সেপ্টেম্বর) রাত আনুমানিক ২টার দিকে এসআই খায়রুল ও তার কয়েকজন সোর্স ওই নারীর বাড়িতে গিয়ে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। স্বামীকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার কথা বলে এসআই খায়রুল ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। বিষয়টি নিয়ে খায়রুলের সঙ্গে ওই নারীর কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে খায়রুল ও তার সোর্সরা তাকে ধর্ষণ করেন। বিষয়টি কাউকে জানালে গৃহবধূকেও মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেয়া হয়।

মঙ্গলবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গৃহবধূ যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে গেলে বিষয়টি প্রকাশ পায়। হাসপাতালে ডাক্তারকে গিয়ে গৃহবধূ বললেন গণধর্ষণের শিকার তিনি। এরপর পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনার সত্যতা জানতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সেই সঙ্গে গৃহবধূ ও অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন তারা।

যশোরের পুলিশ সুপার মঈনুল হক বলেন, গৃহবধূর অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছি। মঙ্গলবার রাতে ওই নারীর সামনে এসআই খায়রুলসহ চারজনকে হাজির করা হয়। খায়রুল ছাড়া অপর তিনজনকে চিনতে পেরেছেন গৃহবধূ। ঘটনার সঙ্গে জড়িত যেই হোক না কেন তাদের ছাড় দেয়া হবে না। এ ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক আরিফ আহম্মেদ জানিয়েছেন, ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিবেদন আসার পর বিস্তারিত জানা যাবে।

জামাল হোসেন/এএম/পিআর