এলাকার আতঙ্ক কাঞ্চন বিশ্বাস

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মানিকগঞ্জ
প্রকাশিত: ১০:৩৬ এএম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে সহজ-সরল মানুষদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি, চাঁদাবাজি, জাল দলিল দিয়ে জমি দখল, প্রতারণাসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ উঠেছে কাঞ্চন বিশ্বাস নামে ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সম্প্রতি ক্ষমতাসীন দলের পদ বাগিয়ে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। এলাকায় তিনি এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ভয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না।

তবে অভিযুক্ত কাঞ্চন বিশ্বাসের দাবি- সামাজিক সুনাম ক্ষুণ্ন করতে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

এক মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলার প্রতিবাদে গত বৃহস্পতিবার (১২ সেপ্টেম্বর) কাঞ্চন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মানববন্ধন হয়েছে। হরিরামপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে ভুক্তভোগীরা তার নানা অপকর্মের চিত্র তুলে ধরেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে জেলা প্রশাসক বরাবর তার বিরুদ্ধে স্মারকলিপি দেয়া হয়।

একাধিক ভুক্তভোগীরে সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হরিরামপুর উপজেলার রামকৃঞ্চপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মো. কাঞ্চন বিশ্বাস এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। নিজের অপকর্ম ঢাকতে সম্প্রতি স্থানীয় একটি পত্রিকার প্রতিনিধিও হয়েছেন তিনি।

মুক্তিযোদ্ধা সেকেন্দার হায়াত খান মজলিস জানান, সাভারের একটি জমি লিজ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে উপজেলার ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে কাঞ্চন বিশ্বাস কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তিনিও সরল বিশ্বাসে কাঞ্চনকে ৩ লাখ টাকা দেন। কিন্তু জমিতো দূরের কথা টাকাও ফেরত দিচ্ছে না। টাকা চাইলেই তাকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখান। সর্বশেষ আদালতে তার বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের একটি মিথ্যা মামলা দিয়েছেন কাঞ্চন বিশ্বাস। যার প্রতিবাদেই মুক্তিযোদ্ধারা মানববন্ধন করেন।

উপজেলার দিয়াপাড় গ্রামের মৃত ফজর উদ্দিন বেপারীর ছেলে আলম বেপারী জানান, জমি সংক্রান্ত একটি সমস্যা সমাধান করে দেয়ার কথা বলে কাঞ্চন বিশ্বাস তার কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং ভুয়া দলিল বানিয়ে দিয়ে আরও ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেন। কিন্তু জমির সেই সমস্যার সমাধান হয়নি।

একই গ্রামের মৃত মোকছেদ মোল্লার দুই ছেলে মহিদ মোল্লা এবং শহিদ মোল্লার অভিযোগ, কাঞ্চন বিশ্বাস তাদের নামে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ব্যাংক থেকে ৩৬ হাজার টাকা কৃষি ঋণ উত্তোলন করেছেন। বর্তমানে সুদে আসলে টাকার পরিমাণ দাড়িয়েছে ৭২ হাজারে। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর কাঞ্চন বিশ্বাস ঋণের টাকা নিজে পরিশোধ করবে বলে জানালেও এখন তা অস্বীকার করছেন। মিথ্যা ঋণের বোঝা কাঁদে নিয়ে দুই ভাই এখন দিশেহারা।

শাহিদা খাতুন নামে এক নারী জানান, ২০০০ সালে এক লাখ টাকা নিয়ে ভুয়া নিয়োগপত্রের মাধ্যমে কাঞ্চন মাস্টার তাকে পিয়াজচর বেসরকারি (বর্তমানে সরকারি) প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের চাকরি দেন। এর প্রতিবাদ করায় তার ছেলেকে একটি মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।

এছাড়া সাহেব আলী নামে এক ব্যক্তি কাঞ্চন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে ৫ পৃষ্ঠার এক অভিযোগপত্র দায়ের করেছেন। যেখানে তার বিভিন্ন অপকর্মের তথ্য রয়েছে।

সেখানে উল্লেখ করা হয়- কাঞ্চন বিশ্বাস ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে প্রাইমারি স্কুলে সহকারী শিক্ষকের চাকরি নেন। তার নিয়োগ নিয়ে আদালতে মামলাও হয়। অবস্থা বেগতিক বুঝে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন তিনি।

হরিরামপুর উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাসান ইমাম বাবু জানান, কাঞ্চন বিশ্বাস কত মানুষকে যে গৃহহারা করেছে, কত মানুষকে যে সংসার চ্যুত করছে, জাল দলিল তৈরি করে হয়রানি করেছে তার হিসাব নেই। সে একজন মামলাবাজ। মানুষকে ফাঁদে ফেলে চাঁদাবাজি করে। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে অফিসের পিয়ন সবাই তার অপকর্মের কথা জানে। কিন্তু মিথ্যা মামলায় ভয়ে কেউ মুখ খুলে না।

মুক্তিযোদ্ধা সেলিম মিয়া জানান, কাঞ্চন বিশ্বাসের নিয়ন্ত্রণে কিছু নারী আছে। যাদের দিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনকে হয়রানি করেন তিনি। মামলা হামলা করে টাকা-পয়সা ইনকামই তার বড় ধান্দা। তিনি বর্তমানে গাড়ি নিয়ে চলাফেরা করেন।

হরিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবুল বাশার সবুজ জানান, সমাজের যারা নিকৃষ্ট লোক তাদের সঙ্গেই কাঞ্চন মাস্টারের ওঠা-বসা। সাধারণ মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষকসহ নিরীহ মানুষের ওপর তার আক্রমণটা বেশি। তার জন্য হরিরামপুরবাসী কলঙ্কিত। আমরাও লজ্জাবোধ করি। ওনার নাম শুনলেই মানুষ ধিক্কার দেয়। কিন্তু মিথ্যা মামলায় জড়াবে বলে তার সামনে কেউ কিছু বলে না।

ভুক্তভোগীরা বলেন,তিনি আগে কখনো আওয়ামী লীগ না করলেও বছরখানেক আগে হঠাৎ রাজনীতিতে নাম লেখান। হঠাৎ করে এসে তিনি রামকৃঞ্চপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতির পদ বাগিয়ে নেন। অপকর্ম আড়াল করতেই তিনি সরকারি দলে নাম লিখিয়েছেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে কাঞ্চন বিশ্বাস বলেন, একটি দল আমার বিরুদ্ধে লেগেছে। তারা মিথ্যা অভিযোগ করছে। আমি চাইলে কালকে একজনের বিরুদ্ধে ১০০ জন ভুক্তভোগী দিয়ে অভিযোগ করাতে পারি।

জেলা ও উপজেলার কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের কাছে যাচাই করেন আমি কেমন। শত্রুতাবশত আমাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন এবং সুনাম নষ্ট করার জন্যই এগুলো করা হচ্ছে। কারণ আমার ভালো কেউ দেখতে পারছে না।

বি.এম খোরশেদ/আরএআর/এমএস