গ্রামটি এখন ‘কারিগরপাড়া’ হিসেবে পরিচিত
ঝুট কাপড় থেকে সুতা তুলে ভাগ্য বদলেছে নওগাঁর মান্দা উপজেলার গণেশপুর গ্রামের অস্বচ্ছল পরিবারগুলো। ঝুট কাপড়কে কেন্দ্র করে সেখানে গড়ে উঠেছে বাড়ি বাড়ি কারখানা। যা পাল্টে দিয়েছে প্রান্তিক জনপদের অসহায় পরিবারের জীবন-যাত্রার মান ও গ্রামীণ অর্থনীতি।
এ গ্রামে প্রায় আড়াইশ পরিবার এ পেশার সঙ্গে জড়িত। গ্রামটি এখন ‘কারিগরপাড়া’ গ্রাম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ঝুট কাপড়ের সুতাকে কাজে লাগিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে একটি গামছা-তোয়ালে তৈরির কারখানা। তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এসব কারিগরদের জীবনমান আরও উন্নত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপজেলার গণেশপুর ইউনিয়নের গণেশপুর গ্রাম। এ গ্রামে প্রায় আড়াইশ পরিবারের বসবাস। একসময় এ গ্রামের গৃহবধূরা অলস সময় পার করতেন। আবার স্বামী পরিত্যক্তরা কৃষিসহ বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
গত তিন বছর আগে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার শাওইল গ্রামের শাহজান আলী শেখ গণেশপুর গ্রামে তার ভায়রা ভাই মাসুদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। তিনি এ গ্রামের নারীদের কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য ঝুট কাপড় থেকে সুতা উঠানোর বিষয় নিয়ে কথা বলেন। পরে তিনি নিজ থেকেই পাঁচটি সুতা উঠানোর চরকি ও নারীদের কাজ শিখিয়ে দেন। এছাড়া নিজ থেকেই পোশাক কারখানার সুইটার, কটন, ববিন, ফিস, মকমল, ভুষা, তিরকির ও রুলের ঝুট সুতা সরবরাহ করেন।

এরপর থেকেই মহিলারা সুতা উঠানোর কাজ শুরু করেন। সপ্তাহ পর পর মহাজনরা এসে প্রকারভেদে ১৫-৪০ টাকা কেজি হিসেবে সুতার দাম পরিশোধ করে নিয়ে যান। এরপর বাড়তে থাকে চাহিদা। সাংসারিক কাজের পাশাপাশি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে সুতা উঠানোর কাজ। এতে পাল্টে যায় এ গ্রামের জীবনমান।
এখন গ্রামটি ‘কারিগরপাড়া’ গ্রাম হিসেবে পরিচিত। এছাড়া নিজেরাই ঝুট কাপড় নিয়ে সুতা উঠিয়ে তাঁতের মাধ্যমে গামছা ও তোয়ালে তৈরি করছেন।
গণেশপুর গ্রামের গৃহবধূ ফেরদৌসি জাগো নিউজকে বলেন, গত ১৩ বছর আগে দুই সন্তানকে রেখে স্বামী ছেড়ে চলে গেছেন। এরপর থেকে মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসার চলতো। গত তিন বছর আগে আমাদের গ্রামে বেড়াতে আসেন এক ব্যবসায়ী। তিনিই ঝুট কাপড় থেকে সুতা উঠানোর বিষয়টি আমাদের শিখিয়ে দেন। পরে সান্তাহার থেকে ঝুট কাপড় ও সুতা উঠানোর চরকি নিয়ে আসেন তিনি। এরপর থেকে বাড়িতেই প্রতি কেজি সুতা প্রকারভেদে ১৫-৪০ টাকা কেজি দরে উঠানো হয়।
তিনি বলেন, অভাব নেই, তারপরও বসে না থেকে কাজ করছি। নাই মামার চেয়ে কানা মামাই ভালো। কাজ নেই, কি আর করার! তাই, ঝুট কাপড় থেকে সুতা উঠানোর কাজ করে থাকি। এখান থেকে যা আয় আসে তা দিয়ে সংসারের কাজে খরচ করা হয়।

আরেক গৃহবধূ রহিমা জাগো নিউজকে বলেন, সান্তাহার থেকে বিভিন্ন রঙের সুতা ও পাউডার নিয়ে আসা হয়। এরপর পরিমাণমতো রং পানিতে মিশিয়ে রোদে শুকিয়ে পরিষ্কার করে চরকাতে সুতা জড়ানো হয়। সপ্তাহ পর পর মহাজনরা এসে সুতা নিয়ে যান।
গৃহবধূ আসমা ও নারগিস বলেন, সাংসারিক কাজের পাশাপাশি ছোট-বড় সবাই মিলে সুতা উঠানোর কাজ করে থাকি। প্রতি সপ্তাহে এক থেকে দেড় হাজার টাকা আয় হয়ে থাকে। এ গ্রামের প্রায় আড়াইশ পরিবার এ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সুতা উঠানোকেই আমরা পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি। সরকারি সুযোগ সুবিধা পেলে আমাদের আরও সুবিধা হতো।
গামছা ব্যবসায়ী মাজেদুল শেখ বলেন, ঝুট কাপড় থেকে সুতা তুলে সেখান থেকে গামছা ও তোয়ালে তৈরি করা হয়। এরপর জেলার সুতিহাট, দেলুয়াবাড়ী, চৌবাড়িয়া, মহাদেবপুর, মাতাজিহাট, নওগাঁ শহর এবং সান্তাহারে গিয়ে ৬০ টাকা পিস খুচরা বিক্রি করা হয়।
স্থানীয় গণেশপুর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড মেম্বার বিমল কুমার প্রামাণিক জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের গণেশপুর কারিগরপাড়ার গরিব ও অস্বচ্ছল পরিবারগুলো ঝুট কাপড় থেকে সুতা তৈরি করে স্বচ্ছলতার সহিত জীবনযাপন করছেন।
আব্বাস আলী/এমএএস/এমএস