ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে বরগুনায় ৩০৪৫ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি বরগুনা
প্রকাশিত: ০৯:৩৯ পিএম, ২৩ মে ২০২০

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে বরগুনায় ২৬৩ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এই ফসলের মূল্য ছয় কোটি ১৬ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ। এছাড়া ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তিন হাজার ৪৫ জন কৃষক।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ১৬ হাজার পাঁচশ ৮৪ হেক্টর জমিতে ফসল আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে ২০৬ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মধ্যে রয়েছে ভুট্টা, চিনাবাদাম, সূর্যমুখী, তিল, মরিচ, সবজি, পান, কলা, পেঁপে এবং আম।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্র জানায়, জেলায় ভুট্টা আবাদ করা হয়েছিল ছয়শ পাঁচ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের আগে ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি একশ ২১ হেক্টর জমির ভুট্টা। ফলে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হেক্টর জমির ভুট্টা। এতে ভুট্টার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে পাঁচ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য দেড় লাখ টাকা। চিনাবাদাম আবাদ করা হয়েছিল এক হাজার ৯৫ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের আগে ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি ছয়শ ৫৭ হেক্টর জমির চিনাবাদাম। ফলে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫০ হেক্টর জমির চিনাবাদান। সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে ১০ হেক্টর জমির চিনাবাদাম। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে একশ পাঁচ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য ৬৩ লাখ টাকা।

সূর্যমুখী আবাদ করা হয়েছিল এক হাজার তিনশ ৬৩ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের আগে ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি দুইশ ৭৩ হেক্টর জমির সূর্যমুখী। ফলে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ হেক্টর জমির সূর্যমুখী আর সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে তিন হেক্টর জমির। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে সাড়ে ১৩ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য পৌনে সাত লাখ টাকা। তিল আবাদ করা হয়েছিল একশ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের আগে ঘরে তোলা সম্ভব হয়নি ৯৯ হেক্টর জমির তিল। ফলে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪০ হেক্টর জমির তিল। আর সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে ২০ হেক্টর জমির তিল। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে ৩০ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য ১২ লাখ টাকা।

সবজি আবাদ করা হয়েছিল দুই হাজার আটশ ৬৫ হেক্টর জমিতে। ঘূর্ণিঝড়ে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে ২৫ হেক্টর জমির সবজি। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে সাতশ ৫০ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য এক কোটি ৮৭ লাখ টাকা। মরিচ আবাদ করা হয়েছিল ৬৭ হেক্টর জমিতে। যার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে পাঁচ হেক্টর জমির মরিচ। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে ১৫ মেট্রিক টন মরিচ। যার বাজার মূল্য ছয় লাখ টাকা। পানের বরজ আছে চারশ ৫০ হেক্টর জমিজুড়ে। যার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে ৪০ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য পৌনে ৬২ লাখ টাকা।

জেলায় কলার বাগান আছে দুইশ ১০ হেক্টর জমিতে। যার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে ২৪ হেক্টর জমির কলা বাগান। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে সাতশ ৮৪ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য এক কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

পেঁপে আবাদ করা হয়েছিল ৭৯ হেক্টর জমিতে। যার মধ্যে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে ২০ হেক্টর জমির পেঁপে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে ছয়শ ৫৩ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য এককোটি ৯৮ লাখ টাকা। এছাড়া আমের বাগান আছে এক হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে। যার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে ৭৭ মেট্রিক টন। যার বাজার মূল্য ২৪ লাখ টাকা।

বুড়িরচর ইউনিয়নের হাজারবিঘা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম বলেন, এ বছর ১০ শতাংশ জমিতে মরিচ চাষ করেছিলাম। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ে পানি ঢুকে ক্ষেতের মরিচ ও গাছ নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতি বছর চার থেকে পাঁচ মণ মরিচ ঘরে তুলি। কিন্তু এ বছর মরিচ কিনে খেতে হবে আমাদের।

কুমরাখালি এলাকার সবজি চাষি কালাম বলেন, ৪০ শতাংশ জমিতে এ বছর করলা চাষ করেছিলাম। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে করলা ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। এতে প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে।

খেজুরতলা গ্রামের কৃষক নাসিরুদ্দীন বলেন, ২০ শতাংশ জমিতে চিনা বাদাম আবাদ করেছিলাম। ফলনও ভালো হয়েছিল। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ে পানি ঢুকে সব নষ্ট হয়ে গেছে।

সোনার বাংলা গ্রামের কৃষক ইউনুস জোমাদ্দার বলেন, ৪০ শতাংশ জমিতে তিল চাষ করেছিলাম। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ক্ষেতে পানি ঢুকেছিল। পরে পানি নেমে গেলেও ক্ষেতের গাছ শুকিয়ে যায়।

ছোট লবণগোলা গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, আম্ফানের তাণ্ডবে জোয়ারের পানিতে বাদাম ক্ষেত তলিয়ে যায়। তাই বাদাম নষ্ট যাওয়ার কারণে পরিপক্ক হওয়ার আগেই বাদাম তুলে নিচ্ছি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক এস এম বদরুল আলম বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে জেলায় দুইশ ৬৩ হেক্টর জমির ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একশ সাত হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের এবং কৃষকের তালিকা করে মন্ত্রণলায়ে পাঠিয়েছি।

এ বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের অন্যান্য জেলার তুলনায় অনেক কম ক্ষতি হয়েছে বরগুনায়। ঘূর্ণিঝড়ে যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের সহায়তা করা হবে।

মিরাজ/এএম/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]