জীবনই বাঁচে না, আর ঈদ!

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি লালমনিরহাট
প্রকাশিত: ০৭:৩২ পিএম, ৩১ জুলাই ২০২০

ঈদের কথা বলতেই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, জীবনই তো বাঁচে না, আর ঈদ। হামার তো ঈদ নাই বাহে। বাড়ি-ভিটাসহ ৫ বিঘা জমি ছিল সম্বল। তাও নদীর ভাঙনে শেষ। এখন নদীত বাড়ি ভিটে হারিয়ে এই বাঁধে আশ্রয় নিয়া আছি। এভাবেই বলছিলেন তিস্তা পাড়ের বাঘের চরের বৃদ্ধা প্রতিবন্ধী লাইলী বেগম (৬০)।

অসহায় ওই বৃদ্ধার বাড়ি লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান ইউনিয়নের বাঘের চর গ্রামে। তিস্তা নদীতে সব হারিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাধেঁর রাস্তায় আশ্রায় নিয়ে বৃদ্ধ স্বামীকে নিয়ে বাস করছেন প্রতিবন্ধী লাইলী বেগম। এক সময় ১ ছেলে ২ মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার ছিল।

jagonews24

আর একদিন পর কোরবানির ঈদ। ঈদকে ঘিরে সবার মধ্যে আনন্দ বিরাজ করলেও লালমনিরহাটের ৬৩টি চরের বন্যাদুর্গত জনপদে নেই ঈদ আনন্দ। বরং ত্রাণের জন্য বিভিন্ন জায়গায় তাদের ছোটাছুটি করতে হচ্ছে।

প্রতি বছরের বন্যায় চরাঞ্চলের মানুষগুলো যেভাবে বন্যার পানিতে ভাসমান জীবন যাপন করেন ঠিক তেমনিভাবে ভাঙনের শিকার হয়ে বাস্তুহীন হয়ে পড়েন। এসব পরিস্থতির কারণে তাদের কাছে ঈদ যেন একদিকে নিরানন্দ, অন্যদিকে হৃদয় ভাঙা কষ্ট।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ এ চরাঞ্চলের মানুষের চিরদিনের নিত্য সঙ্গী। বন্যায় বাঁধ ভেঙে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে উঁচুস্থানে। আশ্রয়কেন্দ্রের স্বল্পতার কারনে অনেকে খোলা আকাশের নিচে জীবন যাপন করছে।

jagonews24

হাতীবান্ধা উপজেলার চর সিন্দুর্না গ্রামের সায়েদ আলী তিস্তা গর্ভে ঘর-বাড়ি হারিয়েছের কিছুদিন আগে। এখন অন্যের জমিতে টিনের চাল পেতে পরিবার নিয়ে বাস করছেন। তাকে ঈদের কথা বলতেই ডুকরে কেঁদে উঠে, বলতে গিয়ে আর বলে উঠতে পরেননি। এ রকম হাজারো মানুষ আছে হয়তো এভাবেই দুঃখ কষ্টকে বুকে আগলে ধরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে দিন অতিবাহিত করছেন। চরবাসীরা ঈদ আনন্দ বুঝলেও পারে না ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার ৫ উপজেলায় তিস্তার ভাঙনের শিকার হয়ে বাঁধের রাস্তায় কেউবা অন্যের জমিতে টিনের চালা করে পরিবার নিয়ে কোনোমতে বাস করছেন। চরগুলোতে চলছে শুধুই হাহাকার। তিস্তা ও ধরলার ভয়াবহ ভাঙনে জেলার ৫ উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার পরিবার ভিটে হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।

বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর থেকে লালমনিরহাট সদরের চর গোকুন্ডা, আদিতমারী উপজেলার বাহাদুরপাড়া, চন্ডিমারী, কুটিরপাড়, কালীগঞ্জের আমিনগঞ্জ, চর বৈরাতী, হাতীবান্ধার সিংগীমারী, গড্ডিমারী, ডাউয়াবাড়ি, সিন্দুনা, পাটিকাপাড়া, ফকিরপাড়া, সানিয়াজানের বাঘের চর, নিজ শেখ সুন্দর ও পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রামে তিস্তা নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।

jagonews24

ঝুঁকিতে রয়েছে সলেডি স্প্যার বাঁধসহ সব বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে আদিতমারীর কুটিরপাড়া ও বাহাদুরপাড়া গ্রামের বালুর বাঁধ।

হাতীবান্ধা উপজেলার সানিয়াজান ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, বন্যার্তদের সহায়তায় এ পর্যন্ত সরকারের জিআর হিসেবে বরাদ্দ পেয়েছি মাত্র ১ মেট্রিক টন চাল। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এই ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে ঈদের কোনো আমেজ নেই।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক আবু জাফর জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে সরকারের ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হয়েছে। ফলে কোনো প্রকার মানবিক বিপর্যয় ঘটেনি। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে গৃহনির্মাণে ৭ হাজার করে টাকা দেয়া হয়েছেন।

রবিউল/এমএএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।