ধর্ষণের বিচার চাইতে আদালতের বারান্দায় লুটিয়ে কাঁদলেন তরুণী

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ১০:০৭ পিএম, ২২ নভেম্বর ২০২০
ফাইল ছবি

গত বছর ২৯ জুন শরীয়তপুরের জাজিরার একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল জাজিরা পৌর এলাকার বাসিন্দা মাসুদ ব্যাপারীর বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় তরুণী মাসুদ ও তার সহযোগী শরীফ সরদারকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের মামলা দায়ের করেন।

আজ রোববার (২২ নভেম্বর) ওই ধর্ষণ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম চলছিল শরীয়তপুর নারী ও নিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। মামলার দুইজন সাক্ষী মিথ্যা সাক্ষ্য দিচ্ছে দেখে ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রী আদালতের বারান্দায় লুটিয়ে কান্না করতে থাকেন। এ সময় তার সঙ্গে থাকা স্বজনরাও কান্না করতে থাকেন। তাদের এমন কান্না দেখে আদালত চত্বরে থাকা অনেকেই চোখের পানি ফেলেছেন।

জাজিরা থানা, স্থানীয় সূত্র ও আইনজীবীরা জানান, জাজিরার একটি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে স্থানীয় কলেজের ওই ছাত্রী। তিনি পড়ালেখার পাশাপাশি উপজেলা সদরের একটি রোগনির্ণয় কেন্দ্রে কাজ করতেন। গত বছর ২৯ জুন সন্ধ্যায় নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন পৌর এলাকার বাসিন্দা মাসুদ ব্যাপারী (৩২)। পরে তরুণী সেখান থেকে পালিয়ে গ্রামের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন।

ঘটনার দিন ওই তরুণীকে যারা উদ্ধার করেছিলেন তাদের দুজন মানছুরা বেগম ও আলেকজান বেগম।

আজ রোববার তারা দুজন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার সাক্ষ্য দিতে আসেন। সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ওই দুই নারী আদালতকে জানান, তারা এ ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এ কথা শোনার পরই ধর্ষণের শিকার কলেজ ছাত্রী আদালতের বারান্দায় লুটিয়ে পড়েন। অঝোর ধারায় কান্না করতে থাকেন। সঙ্গে তার মা ও বাবাও অসহায়ের মতো কান্না করতে থাকেন।

ওই দুই নারী ঘটনার দিন গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছিলেন। সেখানে তারা ওই তরুণীকে উদ্ধারের কথা স্বীকার করেন। যা বিভিন্ন টেলিভিশনে প্রচার হয়। এছাড়া গত বছর ১১ জুলাই ওই দুই নারী শরীয়তপুর সিনিয়ন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ওই দিনের ঘটনা বর্ণনা করে জবানবন্দি দেন। সেই জবানবন্দিতে ওই কলেজ ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং তিনি জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসেছেন বলে তারা উল্লেখ করেন।

দেড় বছরের মাথায় মামলার দুজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী তাদের বয়ান বদলে ফেলায় হতাশ হয়ে পড়েন তরুণী। এমন পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা আদলতের বারান্দায় লুটিয়ে কাঁদেন।

অঝোর ধারায় কান্না করতে করতে তরূণী বলেন, ‘আমার জীবন শেষ হয়ে গেছে। পড়ালেখা, স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকা সবই বন্ধ হয়ে গেছে। তারপরও বিচার চাইতে আদালতে আসছি। বিচার চাইতে এসে প্রতিনিয়ত বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে, নানা গঞ্জনা সইতে হচ্ছে। আসামিরা প্রভাবশালী, তারা প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে। আমরা গরিব-এ কারণেই কি বিচার পাব না? সঠিক বিচার না পেলে এ জীবন রাখব না। এ গঞ্জনার জীবন রেখে কী হবে?’

তরুণীর বাবা বলেন, ‘আমার মেয়েটি এখন ঘর থেকে বের হতে পারে না। তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। আদালতে আসলে মারার হুমকি দেয়। তাদের আইনজীবীরাও হুমকি দেয়। এ বিষয় জানিয়ে থানায় জিডিও করেছি।’

তিনি অভিযোগ করেন, প্রভাব বিস্তার করে সাক্ষীদেরও প্রভাবিত করা হয়েছে। আমরা গরিব মানুষ, মামলাটি চালাতে গিয়ে আসামিপক্ষের সঙ্গে পেরে উঠছি না। কেউ আমাদের পাশে নেই। আদালতই পারে আমার মেয়েকে ন্যায়বিচার দিতে।’

মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মির্জা হযরত আলী বলেন, ‘মামলার সাক্ষ্য নেয়ার কার্যক্রম চলছে। আদালতের বাইরে আসামিরা হয়তো সাক্ষীদের প্রভাবিত করেছেন। এ কারণে তারা আগের বয়ান বদলে থাকতে পারেন। আগামী তারিখে একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও চিকিৎসকের সাক্ষ্য নেয়া হবে। আমরা আশা করছি, ভুক্তভোগী নারী ন্যায়বিচার পাবেন।’

ছগির হোসেন/এসআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]