ভারত থেকে ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ১১:৫০ এএম, ২৭ নভেম্বর ২০২০

প্রায় তিন বছর আগে অভাবের তাড়নায় দিনমজুর বাবার সঙ্গে ঢাকা যাওয়ার পথে হারিয়ে যায় মোফাচ্ছেল হক (১৬)। তাকে হারিয়ে তার বাবা সোরাব আলী (৭০) এখন পাগলপ্রায়। মাস তিনেক আগে ভারতে মোফাচ্ছেলের খোঁজ মেলায় তাকে ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুড়ছেন তার মা মরিয়ম বেগম (৪২)।

দিনমজুর সোরাব আলী ও মরিয়ম বেগম দম্পতি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া মাধবরাম কাচিচর গ্রামের বাসিন্দা। তাদের এক ছেলে ও এক মেয়েসহ চারজনের সংসার। নিজের ভিটেমাটি না থাকায় আত্মীয়-স্বজনদের দেয়া ৩-৪ শতক জমিতে কোনো রকমে ছাপড়া ঘর তুলে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন সোরাব আলী। ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার পর কর্মহীন হয়ে পড়েন তিনি। তাই কাজের সন্ধানে একমাত্র ছেলে মোফাচ্ছেল হককে নিয়ে ঢাকা রওনা দেন।

পথিমধ্যে বাসের যাত্রা বিরতির সময় ছেলেকে হারিয়ে ফেলেন সোরাব আলী। অনেক খোঁজ করেও ছেলের সন্ধান পাননি তিনি। একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোকে সোরাব আলী প্রায় পাগল হয়ে গেছেন।

দীর্ঘ তিন বছর পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্রে পরিবারের লোকজন জানতে পারে মোফাচ্ছেল বর্তমানে ভারতের আলীপুরদুয়ার বল্লোক কালচিনি জেলার জায়গাও থানার ব্লেস ফাউন্ডেশন রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ফর (ড্রাগ-অ্যালকাহোল) ডিপেন্ডেন্ট পারসন নামে একটি সংস্থার কাছে রয়েছে। এরপর থেকে ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন মা মরিয়ম বেগম।

মরিয়ম বেগম বলেন, কাজের সন্ধানে গিয়ে ছেলেকে হারিয়ে ফেলায় তার বাবা প্রায় পাগল হয়ে গেছে। কোনো কাজকর্ম করতে পারেন না। অভাবের তাড়নায় মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছি অনেক আগেই। এখন অন্যের বাড়িতে কাজ করে স্বামী-স্ত্রীর দুজনের খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে। ছেলেকে অনেক খুঁজেও কোনো লাভ হয়নি। কোথাও ছেলের হদিস পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ছেলেকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে গিয়েছি। গত ১৭ নভেম্বর কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের অফিসে একটি আবেদন করেছি। ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে সকলের সহযোগিতা কামনা করছি।

মোফাচ্ছেলের মামা সিদ্দিক আলী জানান, ভাগনেকে দেখতে না পেয়ে আমার দুলাভাই পাগলপ্রায়। আমার বোন সারাদিন বিভিন্ন জনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। আমার ভাগনে ভারতে আছে বলে দাদিরাম বসুনিয়া নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে জানতে পেরেছি। তাকে ভারত থেকে ফেরত আনতে সবার সহযোগিতা কামনা করছি।

ব্লেস ফাউন্ডেশন রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ফর (ড্রাগ-অ্যালকাহোল) ডিপেন্ডেন্ট পারসন সংস্থার জমির মালিক দাদিরাম বসুনিয়া বলেন, প্রায় তিন বছর আগে রাস্তায় পাগলের মতো ঘুরছিল মোফাচ্ছেল। তাকে নিয়ে এসে আমরা লালন-পালন করছি। এখনও সে আমাদের কাছেই রয়েছে। ছেলেটির কাছ থেকেই তার বাবা-মায়ের পরিচয় পাই। বাংলাদেশে আমার পরিচিত অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে ওর বাবা-মায়ের খোঁজ পাওয়া পাই।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে অনেকের সঙ্গে কথা হলেও কেউ ছেলেটিকে পরিবারের কাছে ফেরত দেয়ার উদ্যোগ নেয়নি। দুই রাষ্ট্রের অ্যাম্বাসির মাধ্যমে তাকে ফেরত পাঠানো সম্ভব।

এ বিষয়ে ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বলেন, মোফাচ্ছেল হক আমার ইউনিয়নের বাসিন্দা। ছেলেটি হারিয়ে যাওয়ার প্রায় তিন বছর হলো। সে ভারতে আটকা আছে। আমি তার দরিদ্র বাবা-মায়ের হয়ে সরকারের কাছে অনুরোধ করছি তাদের সন্তানকে যেন ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেয়া হয়।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, এ বিষয়ে একটি লিখিত আবেদন পেয়েছি। বিষয়টি আমি মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।

মাসুদ রানা/আরএআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]