বঙ্গবন্ধুর সম্মান পেলেও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি মুক্তিযোদ্ধার
১৯৭৩ সালের ৬ নভেম্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল হাই মিয়ার স্ত্রী ফাতিমা খাতুনের কাছে সমবেদনা জানিয়ে তার বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে একটি চিঠি দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন-‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনার সুযোগ্য স্বামী আত্মোৎসর্গ করেছেন। আপনাকে আমি গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক সমবেদনা। আপনার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি রইল আমার প্রাণঢালা সহানুভূতি। এমন নিঃস্বার্থ মহান দেশপ্রেমিকের স্ত্রী হওয়ার গৌরব লাভ করে সত্যি আপনি ধন্য হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে আপনার পরিবারের সাহায্যার্থে আপনার সংশ্লিষ্ট মহকুমা প্রশাসকের নিকট এক হাজার টাকা পাঠানো হলো। আপনি উক্ত টাকা মহকুমা প্রশাসকের নিকট থেকে সংগ্রহ করুন। আমার প্রাণঢালা ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা নিন।’
বঙ্গবন্ধু নিজে পাবনার সুজানগর উপজেলার খয়রান গ্রামের যে মহান বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল হাই মিয়াকে নিজে এমন স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন তার ভাগ্যে এত বছরেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি জোটেনি। এ মহান মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী ফাতিমা খাতুন জীবনসায়াহ্নে এসে চান, তার স্বামী যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পান। এজন্য তিনি প্রয়োজনীয় সব প্রমাণপত্র নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো ফল পাননি।
১৯৯৭ সালের ১৫ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে স্বামীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও তার বাসস্থান চেয়ে একটি আবেদন পাঠান। কিন্তু কোনো সুরাহা পাননি। এরপর ২০০৯ সালের মে মাসে তিনি আবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এ ব্যাপারে অনুরূপ একটি আবেদন জমা দেন।
ফাতিমা খাতুনের আবেদনে মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় সর্বাধিনায়ক একে খন্দকার সুপারিশ করেছিলেন। তারপরও মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। এরপর চাপাকান্না নিয়ে বছরের পর বছর পার করছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ আব্দুল হাই মিয়ার স্ত্রী ফাতিমা খাতুন। ভাইয়ের বাসায় আশ্রিত থাকছেন বছরের পর বছর। ভাইয়ের আশ্রয়ে থেকে জোটে তার দুমুঠো অন্ন।
সম্প্রতি পাবনা শহরের দিলালপুরে ফাতিমা খাতুনের ভাইয়ের বাসায় বসে তিনি দেশের জন্য তার স্বামীর আত্মত্যাগ ও তার ভাগ্য বিড়ম্বিত জীবনের কথা শোনালেন। জানালেন তাদের বিয়ের মাত্র দেড় বছরের মাথায় তার স্বামী শহীদ হন। স্বামীর প্রতি তার এতোটাই ভালোবাসা ছিল যে, স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি আর বিয়ে করে নতুন সংসারের কথা ভাবতেও পারেননি।
ফাতিমা খাতুন জানান, তার স্বামী ঠাকুরগাঁও জেলা পুলিশ সদস্য হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার পর তিনি ঠাকুরগাঁও থেকে পালিয়ে ভারত চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ নেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি ঠাকুরগাঁও এলাকায় এসে যুদ্ধে গিয়ে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন।
ওইসময় পাক বাহিনীর হাতে আটক থাকাবস্থায় তিনি তার মা ও স্ত্রীর কাছে দুটি আবেগঘন চিঠি লেখেন। যে টিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন যে, পাক হানাদার বাহিনী তাকে নিশ্চিত হত্যা করবে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছর পর ১৯৭৩ সালের ৬ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু অন্যান্য শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মতো তার স্বামীকেও স্মরণ করে তার কাছে পত্র লেখেন এবং কিছু টাকা অনুদান পাঠান। সরকারি কর্মচারী কল্যাণ তহবিল থেকেও তিনি তিন হাজার টাকা সাহায্য পান। এরপর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর কেউ আর তার খোঁজ নেয়নি।
ফাতিমা খাতুনের ভাই অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক খায়রুল আলম তালুকদার জানান, আশির দশকে তিনি চেষ্টা করেন তার বোনের স্বামীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য। কিন্তু তারা আওয়ামীপন্থী তথা মুজিবভক্ত পরিবার হওয়ায় তারা এ কাজে ব্যর্থ হন।

ফাতিমা খাতুন বলেন, ‘আমার কোনো সন্তান নেই। আমি এতটা বছর ভাইয়ের আশ্রয়ে আছি। ভাইয়ের বেকার ছেলেই এখন আমার ছেলে। তাদের সাহায্যে কাটছে আমার জীবন।’
দীর্ঘদিন সুজানগর উপজেলার কাদোয়া গ্রামের বাসাতেই ভাইয়ের বাসাতেই থাকতেন। পরে ভাই পাবনায় শহরের দিলালপুরে বাসা করার পর থেকে সেখানেই থোকেন। সারাদিন তার কোরআন তেলাওয়াত, এবাদত-বন্দেগি করে তার সময় কাটে।
তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমি আশায় বুক বাধি। ১৫ অক্টোবর, ১৯৯৭ সালে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে স্বামীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও আমার একটা বাসস্থানের জন্য একটি আবেদন পাঠাই। কিন্তু কোনো সুরাহা পাইনি। এরপর ২০০৯ সালের মে মাসে আবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে অনুরূপ একটি আবেদন জমা দিই। ওই আবেদনে সুপারিশ করেছিলেন তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.)এবি তাজুল ইসলাম।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় সর্বাধিনায়ক এ কে খন্দকারও তার ওই আবেদনে সুপারিশ পাঠান। তারপরও সচিব পর্যায়ে তার ফাইল আটকে থাকে।
২০১৬ সালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। তখন তিনি আবেদনও করেছিলেন। কিন্তু সুজানগরের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ রহস্যজনক কারণে তার জন্য সুপারিশ করেনি। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বরাবর আপিল করেছেন।
আপিলে বীর মুক্তিযোদ্ধার এই স্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির মধ্যে অত্যন্ত বিরোধজনিত কারণে ও সীমাহীন দুর্নীতির কারণে ন্যায়বিচার পাওয়া যায়নি। অর্থনৈতিক বিষয়ে একটি শহীদ পরিবার অনৈতিক যোগাযোগ না করার কারণে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য আপিল দায়ের করেছি।’
তিনি তার আপিলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত সনদপত্র, তৎকালীন জাতীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ তফিজের প্রত্যয়নপত্র, আহমদপুর ইউনিয়ন কমান্ডার মো. শাহজাহান আলীর প্রত্যয়নপত্র, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ঠাকুরগাঁ জেলা ইউনিট কমান্ডের কমান্ডার মোহাম্মদ খায়রুল আলমের প্রত্যয়নপত্র, সুজানগর উপজেলা কমান্ডার আব্দুল মজিদ সরদারের প্রত্যয়নপত্র, সরকারি কর্মচারী কল্যাণ তহবিল থেকে অনুদানপ্রাপ্তির রশিদ সংযুক্ত করে দিয়েছেন বলে জানান।
তিনি যে আবেদন করেছেন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় সে আপিলের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি-না তাও জানেন না। তিনি শুধু জানেন এগুলো স্থগিত হয়ে আছে।
ফাতিমা খাতুনের আশ্রয়দাতা ভাই খায়রুল আলম তালুকদার জানান, তার বোনের স্বামী মারা যাওয়ার পর তার বোন এতটাই মানসিক বিপর্যস্ত ছিলেন যে, তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে রাখতে হয়। এখন তিনি পর্দানশীল জীবনযাপন করেন। নামাজ – কালাম পড়ে তার সময় কাটে। রক্তের সম্পর্কের কিছু আত্মীয়-স্বজন ছাড়া অন্যদের সঙ্গে দেখাও করতে চান না। উদ্বেগের মধ্যে তার সারাটি দিনরাত কেটে যায়।
সন্তানহীন অসহায় এই বীরপত্নী আক্ষেপের সুরে জাগো নিউজকে বলেন, ‘তার জীবনের তো চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। স্বামীর আত্মত্যাগের স্বীকৃতিটুকু পেয়ে মরতে চাই। দুঃখ একটাই-কতজন মুক্তিযুদ্ধ না করেই নাকি মুক্তিযোদ্ধা অথচ আমার স্বামী দেশের জন্য জীবন দিয়েও আজও অবহেলিত।’
তিনি বলেন, ভাবুন একবার, বঙ্গবন্ধু নিজে যে পরিবারকে মুক্তিযোদ্ধা সম্বোধন করে চিঠি লিখলেন, সম্মান দিলেন, সেই মুক্তিযোদ্ধাকে স্বীকৃতির জন্য আজ দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, জানি যুদ্ধ না করেও অনেকে মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়েছেন, ভাতা তুলছেন অথচ তার স্বামী আজও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিটুকু পেলেন না-এটাই তার সারা জীবনের দুঃখ।
জানালেন ভাতার জন্য তিনি দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘোরেননি। তিনি বলেন, ‘এখন জীবনসায়াহ্নে এসে টাকার প্রতি কোনো লোভ নেই। তবে যতদিন বেঁচে থাকি অন্তত গর্বের সঙ্গে যেন বলতে পারি, আমার স্বামী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আক্ষেপ এটাই যে, বঙ্গবন্ধু তাকে স্বীকৃতি দিয়ে গেছেন অথচ আজও তিনি স্বীকৃতি পেলেন না।
ক্ষোভের সঙ্গে ফাতিমা খাতুন বলেন, কাউকে যদি উৎকোচ দিতেন তাহলে হয়তো স্বীকৃতি আগেই জুটত। কিন্তু তিনি তা করতে চান না। তিনি তার স্বামীর মর্যাদা টাকা দিয়ে কিনে নিতে চান না বলে জানান।
তার ভাই খায়রুল আলম তালুকদার জানান, ১৯৭১ সাল থেকে তার বোন শুধু কেঁদেই চলেছেন। কান্না ছাড়া আর তার কপালে কিছু জোটেনি। তিনি আজও বিশ্বাস করেন, তার স্বামীর মর্যাদা তিনি পাবেন এবং সেই আশাতেই বেঁচে আছেন।
বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত চিঠিটা আজও যত্ন করে রেখে দিয়েছেন ফাতিমা। তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই আবেদন, বঙ্গবন্ধুর দেয়া তার স্বামীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিটি যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে বহাল করা হয়। দেশের জন্য তার স্বামী শহীদ হয়েছেন, সেই মর্যাদাটুকু তিনি ফিরে পেলেই তার সারাজীবনে পাওয়া দুঃখ লাঘব হবে।
এ ব্যাপারে পাবনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার (এখন কমিটি নেই) বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ সেলিম বুধবার (১৬ ডিসেম্বর) সকালে জাগো নিউজকে জানান, স্থানীয়ভাবে তাদের এখন কিছুই করার নেই। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দিতে পারে।
আমিন ইসলাম/এসআর/এমকেএইচ