শীত গেলেই অভাব ফিরে আসে তাঁতিদের ঘরে

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঠাকুরগাঁও
প্রকাশিত: ০২:২৬ পিএম, ০৪ জানুয়ারি ২০২১

‘শীতের দিন কম্বল বিক্রি করে হামার (আমাদের) সংসার ভালই চলে। কিন্তু শীত যখন চলে যায় তখন কিভাবে চলিমো (চলবো), চলার মতো বুদ্ধি আর থাকে না। তখন কাহ (কেউ) ঢাকাই গিয়া (গিয়ে) রিক্সা চালাই। কাহ (কেউ) দুরত (দূরে) গিয়ে ভাটায় কাম (কাজ) করে। এভাবে সংসার চালানো ধায়ফাই (কঠিন) হয়ে পরে। তখন দেনা মাহাজান (ঋণ) বেশি হয়ে যায়। পরে আবার শীত আসে। তখন করি কি, সুতা নিয়ে আসে আবার কম্বল তৈরি করে বিক্রির টাকা মহাজনের ঋণ পরিশোধ করি। তখন ঘুরি ফিরে শীতও গেল, আবার অভাবও ফেরত (ফিরে) আসিল।’

এভাবেই নিজেদের জীবনযাপনের কথা বলছিলেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কেশড়বাড়ি তাঁত পল্লীর কারিগর সচিন।

এক সময় তাঁত পল্লীর ৫০০ তাঁতের খট খট শব্দে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কেশুরবাড়ি এলাকা মুখরিত হলেও এখন পুঁজির অভাবে তা প্রায় বন্ধের পথে। পৈতৃক পেশা ছাড়তে না পাড়ায় ধার দেনা করে কোনোভাবে টিকে রয়েছেন তাঁতিরা। অনেকে স্থানীয় মহাজনদের কাছে চড়া সুদে টাকা নিয়ে ব্যবসায় খাটিয়ে লোকসান হওয়ায় মহাজনের ভয়ে হয়েছেন এলাকা ছাড়া। কেউ আবার অন্য পেশায় জড়িয়ে বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে ধার দেনা কমাচ্ছেন।

jagonews24

গত বছর এ সময়ে কম্বল কিনতে পাইকাররা তাঁতি পল্লীতে ভিড় করলেও এ বছর পাইকারদের আনাগোনা নেই বললেই চলে। তারপরও স্বল্প লাভে কিছু বিক্রি করলেও পুঁজির অভাবে কম্বল তৈরি করে মজুদ করতে পারছেন বলে জানান তারা।

সরেজমিনে জানা যায়, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এখানকার ৫০০ পরিবারের প্রায় এক হাজার ২০০ মানুষ বংশানুক্রমে তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত। তারা আগে শাড়ি-লুঙ্গি তৈরি করলেও বর্তমানে শুধু কম্বল তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই ২/৩ করে তাঁত রয়েছে। এর কোনোটা চাকাওয়ালা, আবার কোনোটা একেবারেই বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি। কম্বল তৈরি করায় কারো তাঁত সচল আর করোটা অচল হয়ে পড়েছে। সকাল থেকেই নারী-পুরুষসহ বাড়ির সকলে কম্বল তৈরির কাজে ব্যস্ত হলেও অনেকে পরিবার ও জীবিকার তাগিদে পেশা পরির্বতন করেছেন।

রবিন নামের এক তাঁতি বলেন, ‘গত বছর ৪০ কেজি সুতার দাম ছিল দুই হাজার ২০০ থেকে তিন হাজার ২০০ টাকা। এবার সেই সুতার দাম ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। ৪০ কেজি সুতায় দিয়ে ২০ থেকে ২২টি কম্বল তৈরি হয়। কম্বল বিক্রি করে কোনোভাবে আসল টাকা পাওয়া যায়। প্রতি বছর লোকসান হচ্ছে। লোকসানে এলাকার শিবু, টিপু, চন্দনসহ অনেক তাঁতি বাড়িছাড়া হয়েছেন। আগে সরকার ও বিভিন্ন এনজিও আমাদের কাছে কম্বল কিনে নিত। এখন বাজারে কম দামের ব্লেজারের কম্বল আসার কারণে আমাদের কম্বল কেনে না।’

jagonews24

প্রবীণ তাঁতি ধনেশ চন্দ্র বর্মণ দুঃখ করে বলেন, ‘শীত এলে আমরা এই কম্বল বিক্রি করে সংসারের খরচ চালাই। কিন্তু গরমের সময় কম্বল তৈরি করার কাজ থাকে না। তখন শহরে গিয়ে রিকশা চালাতে বা ইটভাটায় কাজ করতে হয়। সরকার যদি কোনো সহযোগিতা করতো তাহলে সারা বছর আমরা তাঁতের কাজ করতে পারতাম।’ এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে স্বল্পসুদে ঋণ দেয়া হলে এই পুরনো দিনের শিল্পকে বাঁচানো যাবে বলে অনেকেই মত দিয়েছেন।

তাঁতি মালী রানী বলেন, ‘অনেক পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু সঠিক মজুরি পাচ্ছি না। অন্যকাজ করতে পারিনা। সেজন্য এখন কম্বল তৈরি করি।’

ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক ড. কে এম কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ও তাঁতিদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারিভাবে সুযোগসুবিধা দেয়াসহ তাদের কম্বল বাজারজাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

তানভীর হাসান তানু/ইএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।