ভারসাম্যহীন নারীকে নিজের কাছে লালন, ১ যুগ পর ফিরিয়ে দিলেন পরিবারে

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ০৭:৩৬ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২১

দীর্ঘ ১১ বছর মানসিক ভারসাম্যহীন এক নারীকে আদর-যত্নে লালন-পালন করে পরিবারের কাছে পৌঁছে দিয়ে মানবতার এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রনি নামের এক যুবক। ঘটনাটি ঘটেছে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ধুবরিয়া গ্রামে।

আশ্রয়দাতা ওই যুবকের নাম আসাদুজ্জামান রনি (৩৭)। তিনি ওই গ্রামের মৃত আব্দুল খালেকের ছেলে ও তেরাস্তা বাজার কমিটির সভাপতি। ওই নারীর নাম দুর্গা। তার বর্তমান বয়স ২৫ বছর। যখন নিখোঁজ হন তখন তার বয়স ছিল ১৫ বছর।

বৃহস্পতিবার (১৪ জানুয়ারি) মো. জাকিরুল ইসলাম নামের স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার অফিসে পরিবারের হাতে ওই নারীকে তুলে দেয়া হয়। এসময় পরিবারের সদস্যদের দেখতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দুর্গা রানী।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, মানসিক ভারসাম্যহীন ওই নারীকে ২০১০ সালের দিকে ধুবড়িয়া ইউনিয়নের ডিজিটাল বলরামপুর বাজার, পুরাতন বাজার, ধুবড়িয়া তেরাস্তা বাজারে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঘুরতে দেখা যায়। তাকে স্থানীয় লোকজন নাম-পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তিনি কিছুই বলতে পারতেন না। পরে ওই নারী আশ্রয় নেন ধুবড়িয়া তেরাস্তা বাজারে। এরপর থেকে তার লালন-পালনের দায়িত্ব নেন সমিল মালিক রনি। নাম-পরিচয়হীন নারীর নাম রাখেন লাইলী। পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য খুঁজতে থাকেন ঠিকানা ও পরিচয়। অবশেষে দীর্ঘ ১১ বছর পর ওই নারীর পরিবারের সন্ধান পান তিনি। জানতে পারেন, লাইলীর আসল নাম দুর্গা রানী।

jagonews24

দুর্গা রানীর স্বামী রমেশের বাড়ি দিনাজপুরের সস্তীতলা শহীদুল কলোনিতে। বাবার বাড়ি বগুড়া জেলার সান্তাহারের সুইপার কলোনিতে। দুর্গা রানী ওই কলোনির রতন হরিজনের মেয়ে।

স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে আসা রমেশ জানান, হারিয়ে যাওয়ার আগে কিছু মানসিক সমস্যা দেখা দেয় দুর্গার। তাকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ খাওয়ানো হয়। এরই মাঝে ১১ বছর আগে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হন তার স্ত্রী। এরপর থেকে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুজি করেও তাকে আর পাওয়া যায়নি।

হারিয়ে যাওয়া ভারসাম্যহীন বোন দুর্গাকে ফিরে পেয়ে ভাই নাদিম হরিজন, আরমান হরিজন, শাকিল হরিজন, প্রদীপ হরিজন, রিপন হরিজন আশ্রয়তাদা রিপনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তারা বলেন, ‘প্রায় ১১ বছর ধরে রনি ভাই আমাদের বোনকে স্বযত্নে লালন-পালন করে আজ আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এটা মানবতার এক অনন্য উদাহরণ। আমাদের বোনকে ফিরে পেয়ে আমরা খুবই আনন্দিত। রনি ভাইকে ধন্যবাদ দেয়ার ভাষা আমাদের জানা নেই।’

অশ্রুসিক্ত নয়নে আশ্রয়দাতা রনি বলেন, ‘১১ বছর ধরে মেয়েটির পরিচয় ও পরিবারের সন্ধান পেতে বিভিন্ন মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়েছি। অবশেষে কোনো উপায় না পেয়ে ফেসবুকে তার সন্ধান পেতে ছবিসম্বলিত একটি পোস্ট দিই। ফেসবুকের সুফলে পাওয়া যায় মেয়েটির পরিবারের সন্ধান।’

তিনি জানান, মেয়েটিকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। মেয়েটি যেন বাকি জীবনটা তার পরিবারের সঙ্গে সুখে-শান্তিতে কাটাতে পারে। সৃষ্টিকর্তার কাছে সেই প্রার্থনা করি। শুধু তাই নয়, দুর্গার চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনে সব ধরনের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

নাগরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা মো. আওলাদ হোসেন লিটন বলেন, ‘আমরা যে কাজটি করতে পারিনি রনি তা করে দেখিয়েছেন। মানবতা আজও বেঁচে আছে— এটা তারই সাক্ষ্য বহন করে।’

তিনি বলেন, ‘দিনাজপুরে বসবাসকারী আমার ভাই দীলিপের সঙ্গে দুর্গার (লাইলী) বিষয়ে আলাপ করি। সে ফেসবুকে ছবিটি পোস্ট করলে তার বন্ধুরা সেটি শেয়ার করেন। ফেসবুকের পোস্টেই নিশ্চিত হয় দুর্গার পরিচয়। এরপর দিনাজপুরের হরিজন সম্প্রদায়ের নেতারা দীলিপের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’

ধুবড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান মো. শাকিল হোসেন ও বর্তমান চেয়ারম্যান মো. মতিয়ার রহমান বলেন, ‘শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন করেছেন। তাই আজ দুর্গা হরিজনকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের সহায়তায় খুঁজে পেয়েছে তার পরিবার।’

নাগরপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আমিনুল বলেন, ‘মানবতার কাছে পৃথিবীর সব আইন তুচ্ছ। রনি ভাইয়ের মানবতায় ভারসাম্যহীন মেয়েটিকে তার পরিবার ফিরে পেয়েছে। সত্যিই এটা মানবতার এক অনন্য উদাহরণ।’

আরিফ উর রহমান টগর/এসআর/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]