প্রচারণায় চমক দেখাতে পারে মসলা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া
প্রকাশিত: ০৫:৪০ পিএম, ২৪ জানুয়ারি ২০২১

বগুড়ার মহাস্থানগড়ের কৃষক হামিদুল হক। বয়স ৫৫ বছর। নিজের ৩ বিঘা জমিতে সারাবছর সবজি চাষ করেন। পাশেই মসলা গবেষণা কেন্দ্র থাকার পরও কেন মসলার চাষ করেন না এমন প্রশ্নে হামিদুল কিছুটা অবাক হলেন।

এরপর জানালেন, মসলা চাষে অনেক ঝামেলা। ঠিকমতো নজর না দিলে গাছ পচে নষ্ট হয়। গবেষণা কেন্দ্র থেকে বীজ পাওয়া গেলেও সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় না। এ কারণে মসলা চাষে আগ্রহ নেই।

পাশেই রায়নগর ইউনিয়নের দক্ষিণ কৃষ্ণপুর, আঁচলাই ও টেপাগাড়ী গ্রাম। সেখানকার কৃষক হাতেম আলী, মফিজুল, নাদিম আলীর জমির প্রধান ফসল আলু। এছাড়া ধানও চাষ করেন। হাতেম আলী একবার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বারি পেঁয়াজের প্রদর্শনী প্লট করেছিলেন।

জানান, প্রদর্শনীর জন্য মসলা গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তারা যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু সেটা পাঁচ বছর আগে। এরপর আর যোগাযোগ করেননি তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার মসলা আমদানি করতে হয়। অথচ গবেষণা বলছে, মসলা উৎপাদনের উর্বর ক্ষেত্র বাংলাদেশ। এ সম্ভাবনা কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া গেলে দেশে মসলা উৎপাদনে স্বনির্ভর হতে পারে। এতে আর্থিকভাবে ভোক্তা, কৃষক উভয়ই লাভবান হবে বলে মনে করেন বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, মসলা উৎপাদনে মাটি যথেষ্ট উপযুক্ত। এখন প্রয়োজন মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া। কৃষকদের অসচেতনতার কারণে তারা মসলা চাষে অনাগ্রহী।

mosla-3.jpg

জানা গেছে, দেশে মসলাজাতীয় ফসলের চাহিদা পূরণে ১৯৯৪ সালে বগুড়ায় স্থাপিত হয় মসলা গবেষণা কেন্দ্র। জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার রায়নগরে ৭০ একর জমির ওপর এই গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। সেই সঙ্গে মাগুরা ও জয়দেবপুরে আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং লালমনিরহাট, ফরিদপুর, কুমিল্লা, সিলেট ও খাগড়াছড়িতে পাঁচটি উপকেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাটিতে পর্যাপ্ত উৎপাদন সম্ভব এমন ১৩ জাতের মসলা গবেষণা করে ২৫ জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে মিলিয়ে এ জাতগুলো চাষ করলে ফল অনেক ভালো পাওয়া সম্ভব।

উদ্ভাবিত জাতের মধ্যে রয়েছে- পেঁয়াজের পাঁচটি, হলুদের পাঁচটি, মরিচের তিনটি, আদার একটি, রসুনের দুটি, ধনের একটি, মেথির দুটি, কালিজিরার একটি, গোলমরিচের একটি, আলুবোখারার একটি, বিলাতি ধনেপাতার একটি, পাতা পেঁয়াজের একটি (শুধু পাতা ব্যবহার হয়) ও পানের দুটি।

বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হামিম রেজা বলেন, নতুন উদ্ভাবিত জাত আমরা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনকে (বিএডিসি) দিয়েছি। এখন তাদের দায়িত্ব বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে কৃষকদের হাতে তুলে দেয়া। এছাড়া নির্ধারিত মূল্যে যেকোনো কৃষক গবেষণা কেন্দ্র থেকেও বীজ সংগ্রহ করতে পারবেন।

তিনি জানান, যদি কৃষকদের মাঝে এ নিয়ে সচেতনতা তৈরি এবং নতুন জাত পর্যাপ্ত পরিমাণে চাষ করা যায় তাহলে কৃষক লাভবান এবং মসলা উৎপাদনও বাড়বে, যা দেশকে মসলা উৎপাদনে স্বনির্ভরশীল করবে।

মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ২০ লাখ ৭৫ হাজার টন। উৎপাদন হয় প্রায় ৯ লাখ টন। বাকি পেঁয়াজ আমদানি করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে দেশে পেঁয়াজ বীজের চাহিদা ১১৫০ টন। এর মধ্যে বিএডিসি উৎপাদন ও সরবরাহ করে মাত্র ১৭ থেকে ২০ টন, কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষণ হয় ১০ টন। বাকিটা বৈধ-অবৈধ পথে আমদানি হয়। এভাবে প্রতি বছর শুধু পেঁয়াজ বা এর বীজ আমদানিতে দেশের হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে।

বর্তমানে দেশে শীতকালে যে পেঁয়াজ চাষ হয় তার উৎপাদন প্রতি হেক্টরে ৪-৫ মেট্রিক টন। যে কারণে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে সারা বছর বিদেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়।

এ কারণেই সারা বছর দেশে পেঁয়াজ চাষের জন্য মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা আগাম ও নাবি খরিপ মৌসুমে চাষ উপযোগী পেঁয়াজের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এই পেঁয়াজের নাম দেয়া হয়েছে বারি পেঁয়াজ-২ ও বারি পেঁয়াজ-৩। বারি পেঁয়াজ অমৌসুমি জাত। এটি খরিপ মৌসুমে অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে চাষের উপযোগী স্বল্প সময়ের একটি ফসল।

মসলাজাতীয় ফসলের মধ্যে হলুদ জনপ্রিয় এবং দৈনন্দিন রান্নায় এর ব্যবহার সর্বজনবিদিত। মসলা হিসেবে ব্যবহার ছাড়াও হলুদ নানাবিধ প্রসাধনী সামগ্রী ও রঙ শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার হয়।

দেশে কৃষক পর্যায়ে হলুদের গড় ফলন প্রতি হেক্টরে ২ দশমিক ২৬ টন। দেশে প্রতি বছর গড়ে ১৫ দশমিক ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে ৩৫ দশমিক ৩০ হাজার মেট্রিক টন হলুদ উৎপাদন হয়, যা চাহিদার তুলনায় খুবই কম।

mosla-3.jpg

ফলে হলুদের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে বারি-১, ২ ও ৩ জাতের উচ্চ ফলনশীল হলুদ উদ্ভাবন করেন। বারি হলুদ-৩ প্রতি হেক্টরে ফলন ২৫ থেকে ৩০ মেট্রিক টন।

পাশাপাশি মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা বারি মেথি-১ নামে একটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন। দেশে এটি মেথির প্রথম উদ্ভাবিত জাত, যা পুষ্টি উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

উন্নত জাতের হলুদ ও মেথি কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কৃষক পর্যায়ে এসব মসলা চাষে আগ্রহ কম।

বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রে ১৯৯৮ সাল থেকে এলাচ চাষের ওপর গবেষণা করা হলেও বিষয়টি এখনও গবেষণা পর্যায়েই রয়েছে।

একইভাবে আদা, রসুন ও জিরা চাষের ওপর গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। আদা ও রসুনের দুটি করে উন্নতজাত গবেষণার অগ্রগতি লাইনে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

গবেষণা বিজ্ঞানীদের মতে, দেশে মসলার উৎপাদন বাড়াতে হলে আগে কৃষকদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। এজন্য মসলার আবাদ অধিক লাভজনক এটি প্রচার ও প্রমাণ করতে হবে। আবহাওয়া উপযোগী জাত উদ্ভাবন করার পর বীজ সরবরাহ ও সহজলভ্য করতে হবে এবং মসলা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব করা গেলে কৃষক মসলা চাষে আরও আগ্রহী হয়ে উঠবেন।

মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হামিম রেজা বলেন, দেশের মসলা উপযোগী অঞ্চল বের করে যদি চাষ করা যায় তাহলে প্রয়োজনীয় মসলা উৎপাদন সম্ভব। এক্ষেত্রে কৃষককে সচেতন করাও জরুরি।

কৃষি বিভাগের সূত্রমতে, দেশে রসুনের চাহিদা বছরে সাড়ে চার লাখ টন হলেও উৎপাদন হয় তিন লাখ টন। আদার চাহিদা বছরে দেড় লাখ টন (বীজসহ) হলেও উৎপাদন হয় প্রায় ৬০ হাজার টন। আমদানি করতে হয় ৯০ হাজার টন।

বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে, গবেষণার ফলাফল মাঠ পর্যায়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া গেলে দেশ মসলা উৎপাদনে এগিয়ে যাবে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

এফএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]