কষ্টে আছেন জোকার নুরুল হক

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি শেরপুর
প্রকাশিত: ০৩:০৪ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

‘একসময় পাড়া-মহল্লার মানুষ দেখতে আইতো। সার্কাসের কামের পাশাপাশি বাড়িতে বাড়িতে খেলা দেখাইয়াও ভালা কামাই হইতো। অ্যাহন শইল পইড়া গ্যাছে, খেলা দেখাইতে পারি না। সার্কাসের মার্কেটও নাই আর’—এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন শেরপুরের নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা চরমধুয়া গ্রামের সার্কাসের জোকার নুরুল হক।

উচ্চতায় ৩ ফুটেরও কম ষাট বছর বয়সী নুরুল হক। ১৯৮০ সালে সার্কাসে যোগ দেন। এরপর দীর্ঘ ২৪ বছরে ছয়টি সার্কাস দলের সঙ্গে জোকার হিসেবে কাজ করেছেন।

নুরুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘১৯৮০ সালে এসএসসি টেস্ট (নির্বাচনী) পরীক্ষার সময় আমগো এলাকায় ‘দি লায়ন সার্কাস’ নামের একটি সার্কাস দল আসে। সে সার্কাস দেখতে গিয়েই মালিকের নজরে আসি আমি। এরপর দিনে ২০ টাকা বেতনে তাদের সাথে কাজ শুরু করি।’

Jokar-(3).jpg

সেই থেকে শুরু করে টানা ২৪ বছর কাজ করেছেন বিভিন্ন সার্কাস দলের সঙ্গে। শারীরিক কৌশল ও পারদর্শিতার কারণে পরবর্তী সময়ে তার মজুরিও বেড়েছে কয়েকগুণ।

কর্মজীবনে মহানগর, দি লায়ন সার্কাস, নিউ স্টার, নিবারন ভূমি, সেভেন স্টার, রওশন সার্কাসের জোকার হিসেবে কাজ করেছেন নুরুল হক। দীর্ঘ সময়ে ১৬টি খেলা রপ্ত করেছিলেন। ২০০৪ সালে অসুস্থ হওয়ার পর ছেড়ে দেন সার্কাসের কাজ। পরে জীবিকার তাগিদে স্থানীয় বাজারে খেলা দেখানো শুরু করেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে ২০০৬ সালে একবারেই কাজ থেকে ছুটি নেন এই জোকার।

নুরুল হকের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত শেরপুর জেলার মাত্র তিনজন সার্কাস দলে কাজ করলেও বাকি দুজন বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন।

Jokar-(3).jpg

বিগত দুই দশকে শেরপুরে সার্কাস দলের জোকার হয়ে কাজ করেছেন নুরুল হক, তোতা মিয়া ও সেকান্দার আলী। তোতা মিয়া গতবছর এবং সেকান্দার আলী বার্ধক্যজনিত কারণে ২০১৮ সালে মারা যান। নুরুল হক বেঁচে থাকলেও নানা অসুস্থতা বাসা বেঁধেছে তার শরীরে। ঠিকমতো ওষুধ কিনতে পারেন না। তিন মেয়ে ও এক ছেলে থাকলেও সবাই বিয়ের পর নিজ সংসারে ব্যস্ত। একটি প্রতিবন্ধী ভাতার টাকায় স্ত্রী মজিরন বেগমকে নিয়ে অভাবের সংসার তার।

নুরুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছেলেমেয়েরা বড় হওয়ার পর সবাইকে বিয়ে-শাদি দিয়ে দিছি। তাদের সংসারেও অভাব। নিজেদের সংসার নিয়েই তারা ব্যস্ত। বছরে দু-একবার আসলেও বেশি খোঁজখবর নেয় না তারা। চেয়ারম্যান একটা প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ড করে দিছে, সেটা দিয়েই খাইয়া-পইরা চলি এখন।’

তিনি বলেন, ‘অভাবের সংসারে ওষুধ কিনতেই বেশি টাকা ফুরাইয়া যায়। আগে তো খেলা দেখাইয়া কিছু পয়সা পাইতাম, তাই দিয়ে কোনোমতে চলতাম। অ্যাহনতো শইল ভার হয়ে গেছে, খেইল দেহাবার পাই না। কষ্টেই আছি, সরকার যদি একটু সহযোগিতা করত তাইলে শেষ কালটা ভালো কাটত।’

Jokar-(3).jpg

নুরুল হকের স্ত্রী মজিরন বেগম বলেন, ‘অসুস্থ শইলে তো কোনো কাম করবার পারে না। আগে তো ক্ষেত কামও করত। দুই বছর ধইরা তাও করবার পারে না। দিন চলা খুব কষ্ট হয়ে গেছে। মাসে আড়াই হাজার টাহার ওষুধ লাগে দুইজনের। সরকার যদি ইক্টু সহযোগিতা করে, তাইলে আমগোর দুঃখটা কমে।’

চন্দ্রকোনা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সাজু সাঈদ সিদ্দিকী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে তার জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করেছি। তিনি চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা চেয়েছেন। আমরা চেষ্টা করছি কী করা যায়। আশা করছি, সহযোগিতা করতে পারব।’

নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘তিনি আমাদের কাছে কোনো সহযোগিতা চেয়ে আবেদন করলে, আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসনের এখতিয়ারের মধ্যে থেকে তাকে সহযোগিতা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা আমরা করব।’

ইমরান হাসান রাব্বী/এসআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]