২৩ হাজার টাকায় দুই শিশু সন্তানকে বিক্রি করলেন অসহায় দম্পতি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ১০:০৬ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

কুড়িগ্রামের উলিপুরে অভাবের তাড়নায় দুই শিশু সন্তানকে ২৩ হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে এক অসহায় দম্পতির বিরুদ্ধে। উপজেলার বুড়াবুড়ী ইউনিয়নের শিমুলতলা এলাকার ফকির মোহাম্মদ গুচ্ছ গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানান, প্রায় ১৫ বছর আগে বুড়াবুড়ী ইউনিয়নের মন্ডল পাড়া গ্রামের মৃত মজিদ মন্ডলের ছেলে খলিল মন্ডলের (৪৫) সাথে বিয়ে হয় একই ইউনিয়নের শিমুলতলা গ্রামের কৃষক মোচকেন আলীর মেয়ে মর্জিনা বেগমের (৩৬)। বিয়ের পর খলিল মন্ডলের কোনো বসতভিটা না থাকায় স্ত্রী মর্জিনা বেগমের চাচা রুস্তম আলীরজমিতে অস্থায়ীভাবে বসবাসের জায়গা দেন।

২০১৩ সালে শিমুলতলা এলাকায় সরকারিভাবে স্থাপিত ফকির মোহাম্মদ গুচ্ছ গ্রাম প্রকল্পে তারা একটি ঘর বরাদ্দ পান। সেখানে থেকে স্বামী-স্ত্রী দুজন দিনমজুরের কাজ শুরু করেন। তাদের সংসারে কলিমা (৯), মিজানুর (৭), ইছানুর (৬) ও খুশি (৪) চার সন্তান রয়েছে।

এরপর থেকে খলিল মন্ডল নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। কোনো কাজকর্ম না করতে পারায় সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারেন না। এর মধ্যে খলিলের স্ত্রী মর্জিনা প্যারালাইজড হয়ে ঘরবন্দি হয়ে পড়েন।

jagonews24

তারা দুই বছর আগে কন্যাশিশু জন্ম দিলে গত ১৫ মাস আগে তাকে তিন হাজার টাকায় কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার শুলকুরবাজার এলাকার এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে বিক্রি করে দেন। আড়াই মাস আগে জন্ম নেয়া আরেকটি কন্যা সন্তানকে কুড়িগ্রাম পৌর শহরের এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন ওই দম্পতি।

খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে খলিল ও মার্জিনার পুরো পরিবারের। কখনো বাবার বাড়ি থেকে সামান্য চাল অথবা প্রতিবেশীদের দেয়া খাবারে দিন কাটে। অভাবের সংসার ও শারীরিকভাবে অসুস্থ দম্পতি সন্তানদের ভরনপোষণ ও খাবারের যোগান দিতে না পারায় প্রথম কন্যা সন্তান কলিমাকে (৯) রংপুরে কাজে দিলেও বয়স কম বলে তাকে ফেরত পাঠায়।

গুচ্ছ গ্রামের বাসিন্দা বানেছা বলেন, ‘ওদের চারটি সন্তান বাড়িতে আছে ও দুটি সন্তানকে দত্তক দিয়েছেন। ওরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই প্রতিবন্ধীর মতো। তাই ওরা কোন কাজ কর্ম করতে না পারায় সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে অক্ষম। তাই তারা দুটি সন্তানকে দত্তক দিয়েছেন।’

একই এলাকার প্রতিবেশী জিয়াউর রহমান বলেন, ‘ওদের কোনো জায়গা জমি নেই। ওরা আবাসন প্রকল্পে ঘর পেয়েছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই পঙ্গু। মেম্বার, চেয়ারম্যান ও প্রতিবেশীরা যে সহযোগিতা প্রদান করেন তা দিয়ে কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে। অভাবের কারণে দুটি সন্তানকে দত্তক দিয়েছেন তারা।’

রূপা নামে আরেক প্রতিবেশী বলেন, ‘স্বামী-স্ত্রী দুজনই প্রতিবন্ধী। ছয়টি সন্তান। একটি সন্তানকে কুড়িগ্রামে ও অপর একটি চর এলাকায় দত্তক দিয়েছেন। স্ত্রী মর্জিনার এক হাত ও এক পা অবশ। তাই সে হাঁটতে পারে না। খাবারের অভাবে একবেলার খাবার তিনবেলা খায়।’

jagonews24

মর্জিনার বাবা মোচকেন আলী বলেন, ‘আমার জামাই ও মেয়ে তারা তাদের সন্তানদের লালন-পালন করতে পারে না। খাদ্যের যোগান দিতে পারে না। এই কারণে দুটি সন্তানকে তারা দত্তক দিয়েছে।’

খলিল মন্ডল জানান, ‘আমি অসুস্থ। কোনো কাজকর্ম করতে পারি না। কোনো জায়গা জমিও নেই। সন্তানদের খাবার দিতে পারি না। তাই দুটি সন্তানকে বিক্রি করেছি।’

খলিলের স্ত্রী মর্জিনা বলেন, ‘আমাদের ছয়টা সন্তান। অসুস্থতার কারণে আমরা কোনো কাজ করতে পারি না। তাই সন্তানদের লালন-পালন করতে পারি না। তাই দুইটা সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছি। তারা কিছু টাকা দিয়েছে। তা দিয়ে কয়েক দিন খেয়েছি ও চিকিৎসা চালিয়েছি।’

এ বিষয়ে উলিপুর উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন মন্টু বলেন, ‘আমি খলিল মন্ডল ও মর্জিনা বেগম দম্পতির একটি দুই মাস বয়সী ও একটি পনের মাস বয়সী সন্তান বিক্রির বিষয়টি আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম। ইউপি চেয়ারম্যান যদি ওই পরিবারকে সহায়তা দেয়ার সামর্থ্য না রাখেন তাহলে আমাদের বিষয়টি অবগত করলে তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার চেষ্টা করতাম।’

উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নূর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, ‘আমি বিষয়টি জানতাম না। আমি উপজেলা চেয়ারম্যানকে বলবো তিনি যেন ওই পরিবারের যাবতীয় খোঁজ খবর নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন ‘

মাসুদ রানা/আরএইচ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]