হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্য ‘ঘাইল ছিয়া’

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৬:১১ পিএম, ০৩ মার্চ ২০২১

মৌলভীবাজারে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে আর্য সংস্কৃতিতে আবিষ্কৃত বাংলার হাজার বছরের প্রাচীন লোকজ ঐতিহ্য উদুখলে (ঘাইল ছিয়া)। কারুশিল্পীরা কাঠ দিয়ে নানান জাতের ঘাইল ও ছিয়া তৈরি করতেন। নকশাখচিত এ ঘাইল ছিয়ায় থাকে হরেক রকম কারুকাজ। লোকজ উৎসবকে সামনে রেখে ঘাইল ছিয়া শিল্পের কারিগররা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

মৌলভীবাজার জেলার চা-বাগান ঘেরা শ্রীমঙ্গল উপজেলার আশিদ্রোন ইউনিয়নের খুশবাস গ্রাম। এক সময় এ গ্রামের শতভাগ মানুষ ঘাইল ছিয়া তৈরির কাজ করতেন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় শতবছরের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প হারিয়ে গেলেও পূর্ব পুরুষদের পেশা হিসেবে অনেকেই ধরে রেখেছেন।

আগে শীতের পিঠাপুলি তৈরির প্রধান উপকরণ চালের গুঁড়ি প্রস্তুত করার জন্য ঘাইল ছিয়াই ছিল একমাত্র ভরসা। আধুনিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের ফলে ও কালের বিবর্তনে এ শিল্প হারিয়ে গেলেও গ্রামীণ জনপদে এখনো এর কদর রয়েছে।

সাধারণত বিশাল গাছের নিচ দিকের গুঁড়ি থেকে এগুলো প্রস্তুত করা হয়। প্রথমে গুঁড়ির ভেতরটা গর্ত করে মসলা বা শস্যাদি রাখার স্থান তৈরি করা হয়। আর একটা লম্বা মসৃণ দণ্ড (ছিয়া) দিয়ে সেই গর্তে রাখা মসলা বা শস্যে জোরে জোরে আঘাত করা হয়। এই আঘাতে মসলা বা শস্যাদি গুঁড়ো হয়।

আদিকালে হাতে পেষার জন্য এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহৃত হলেও আধুনিকতার ছোঁয়া লাগায় অনেক স্থানেই এখন আর এর ব্যবহার দেখা যায় না।

অঞ্চলভেদে এর নামের ভিন্নতা.থাকলেও সিলেট অঞ্চলে একত্রে ‘ঘাইল-ছিয়া’ বলা হয়। নিচের গুঁড়িটাকে ‘ঘাইল’ আর আঘাত করার দণ্ডকে ‘ছিয়া’ বলা হয়।

শীতের পিঠা তৈরির ধুম পড়লে ঘাইল ছিয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। সিলেট বিভাগের গ্রামীণ জনপদ ও শহরে অনুষ্ঠিত লোকজ মেলায় ঘাইল ছিয়া বিক্রি করা হয়।

বিভিন্ন মেলায় এগুলো বিক্রি হতে দেয়া যায়। বৈশাখী মেলাকে সামনে রেখে ঘাইল ছিয়া তৈরি করা হয় এবং বিভিন্ন মেলাতেই বিক্রি হয়। এর বিভিন্ন সাইজ রয়েছে। ছোট, মাঝারি, বড়। ৩০০ থেকে ৭০০ টাকায় পর্যন্ত প্রতিটি ঘাইল বিক্রি হয়।

Ghail-(2).jpg

শ্রীমঙ্গল উপজেলার খুশবাস গ্রামে কথা হয় মতিন মিয়ার (৬০) সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘একসময় এ গ্রামের সবাই ঘাইল ছিয়া তৈরির কাজ করতেন। তবে অভাব-অনটনের জন্য অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন এলাকার ১৫-২০ জন এ কাজ করেন।’

ইউনুছ মিয়া (৬৫) নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, এলাকায় ঘাইল ছিয়ার প্রচলন শত বছরের। আধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরির ফলে এর ব্যবহার দিনদিন কমে যাচ্ছে।

ইউছুফ মিয়া (৫৫) বললেন, ঘাইল ছিয়া আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য। এ শিল্পকে রক্ষা করা প্রয়োজন। তবে সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা আমাদের পাশে আসেনি।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন এলাকা হওয়ায় এখানে বাইরের লোকজনের আনাগোনা বেশি। মাঝে মধ্যে পর্যটকরা শখ করে ঘাইল ছিয়া কিনে নিয়ে যান।

গ্রামের মইন উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি বলেন, শনি ও মঙ্গলবারে শ্রীমঙ্গল বাজারে ঘাইল ছিয়া বিক্রি হয়। তিনি আরও জানান, এক সময় মেয়ের বিয়েতে ঘাইল ছিয়া উপহার দেয়ার রেওয়াজ ছিল।

এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পের কথা তার জানা নেই। কেউ তাকে জানায়নি। বিষয়টি স্থানীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলাপ করে তাদেরকে সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে।

এসআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]