৪০ বিঘাজুড়ে বেইলির খামার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পাবনা
প্রকাশিত: ০৭:০৮ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২১

১৯৮৯ সালের কথা। মাত্র ১১ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বড়ইচরা গ্রামের কৃষাণী বেইলি বেগমের। যিনি আজ দেশের অন্যতম সফল একজন নারী কৃষক। ৪০ বিঘার কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন তিনি।

অথচ অভাবগ্রস্ত স্বামীর সংসারে তিনি এক সময় সন্তানদের ঠিকমতো পড়াশোনাও করাতে পারতেন না। বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনবেন এমন অবস্থাও ছিল না।

jagonews24

এক পর্যায়ে তিনি সরাসরি কৃষিকাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০০২ সালের দিকে স্বামীর ভাইয়ের কাছ থেকে ৫ শতাংশ জমি লিজ নিয়ে লাউ ও মিষ্টিকুমড়ার আবাদ করেন। ‘সাধের লাউ’ তাকে বৈরাগি করেনি বরং সে সময়ে লক্ষাধিক টাকার মুখ দেখায়। উৎসাহিত হন বেইলি বেগম।

২০০৩ সাল থেকে বেইলি বেগম পুরোদস্তুর বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কৃষি খামার গড়ে তোলেন। জমি লিজ নিয়ে শিম চাষ করে এক লাখ ২০ হাজার টাকা মুনাফা পান। উৎসাহ বেড়ে যাওয়ায় ২০০৫ সাল থেকে লেবু চাষ শুরু করেন। ২০০৬ সালে যোগ হয় মুলা ও গাজর। ওই বছর ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকার গাজর বিক্রি করতে পেরেছিলেন বলে মনে আছে তার। ২০০৮ সালে নার্সারি করেন।

বেইলি বেগম কথা প্রসঙ্গে বলেন, লেবু তো নয়, যেন সবুজ সোনা। লেবু চাষে সাফল্যই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নার্সারি ও লেবু চাষে খরচ বাদে নিট লাভ হয় ২৬ লাখ টাকা। ২০০৮ সালের দিকে এক একর ১৬ শতাংশ জমি কেনেন। সে জমির দাম এখন কোটি টাকা।

jagonews24

২০০৯ সালে গাভী মোটাতাজা করার উদ্যোগ নেন। ১৪টি গাভী দিয়ে ডেইরি ফার্ম শুরু করেন। দুধের বাজার না থাকায় তিনি ক্ষতির শিকার হয়েছিলেন। পরে আরও কিছু কারণে বন্ধ করে দেন।

সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করতে দেননি। তাদের লেখাপড়া করিয়েছেন এবং এখনও করাচ্ছেন। তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলের মা।

সন্তানদের পড়ার খরচ থেকে শুরু করে সংসারেও অর্থ জোগাতে শুরু করেন তিনি। বাবার বাড়ির স্বজনরা তাকে যেমন ‘রাখাল’ বলে উপহাস করতেন তেমনি স্বামীর সংসারেও কাজের মূল্যায়ন পাননি।

কিন্তু কোনো কথাই তাকে দমাতে পারেনি জানিয়ে তিনি বলেন, আমি তো বলতে গেলে পেটের দায়ে কৃষক হয়েছিলাম। তাই লক্ষ্য থেকে থেকে পিছপা না হয়ে সামনে এগিয়ে যাই। দূরে সরে যেতে থাকেন প্রথম স্বামী। তাদের বিচ্ছেদ ঘটে বিয়ের ২০ বছর পর। তত দিনে বেইলি বেগম কৃষিতে ব্যাপক সাফল্য পাওয়া একজন নারী উদ্যোক্তা। ব্যক্তিগত জীবনে বিড়ম্বনা নেমে এলেও তিনি কৃষিকাজ ছাড়েননি।

jagonews24

কিছুদিন পর ঈশ্বরদীর খ্যাতিমান চাষি ঈশ্বরদী উপজেলার বড়ইচড়া গ্রামের সিদ্দিকুর রহমান ময়েজের সাথে তার কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় হয়। তারা তাদের স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে একসাথে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। তারা বিয়ে করেন ২০০৯ সালে। শুরু হয় দেশসেরা কৃষক দম্পতির স্বপ্নযাত্রা।

বেইলি বেগম জানান, দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকে আরও জমি কেনেন। এখন সেসব জমি এবং লিজ নেয়া ৪০ বিঘা জমিতে তার খামার চলছে।

জীবনের দ্বিতীয় পর্ব শুরুর পর ধনিয়া চাষ থেকে শুরু করে চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, পেয়ারা, কুল ও গাজর চাষসহ ভেড়ার খামার করেন।

বেইলি বেগম জানান, এখন যে ধনিয়া করা হচ্ছে সেটি আসন্ন রমজান মাসে বাজারে উঠবে। এছাড়া এখন তার খামারে কলা বাগানের মধ্যে বেশ কয়েক বিঘাজুড়ে উন্নত জাতের ধনিয়া বীজ প্লট রয়েছে।

তিনি জানান, নিজের হাতের বীজ ছাড়া বাজারের বীজ নিয়ে সমস্যা হয় প্রায়ই। তাই তিনিই প্রথম জেলায় উন্নত ধনিয়ার বীজ সংগ্রহ শুরু করেন।

সরকারের কৃষি বীজ বিতরণ পদ্ধতি এবং প্রণোদনার বিষয়ে বেইলি বেগম কিছু জটিলতা তুলে ধরে জানান, সামান্য কলাইয়ের এক কেজি বীজ পেতে গেলেও চেয়ারম্যান বা ইউএনওর অনুমতি লাগে। এতে প্রকৃত কৃষক বঞ্চিত হচ্ছে। এটা কৃষক ও কৃষি বিভাগের ওপর ছেড়ে দেয়া দরকার।

তিনি দুঃখ করে বলেন, কৃষক উন্নয়ন সোসাইটি নিয়ে কাজ করেন তিনি। যাতে তার মতো হাজারও বেইলি বেগম দেশে তৈরি হতে পারে। কিন্তু করোনায় ক্ষতি হলেও কোনো প্রকৃত কৃষক ক্ষতিপূরণ বা স্বল্পসুদে ঋণ পাননি।

jagonews24

বেইলি বেগমের স্বামী সিদ্দিকুর রহমান ময়েজ ওরফে কুল ময়েজ জানান, বেইলি বেগমের নিজ উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় একটি সফল খামার গড়ে উঠেছে। যে খামারে সারা বছর কিছু শ্রমিক কাজ পান আর খণ্ডকালীন শ্রমিক তো থাকেই। খামারে তিনি আমার মিসেস নন তিনি একজন সফল কোটিপতি কৃষাণী।

বেইলি বেগম তার খামার ঘুরিয়ে দেখানোর পাশাপাশি জানান তাদের কিছু সমস্যার কথা। তিনি জানান, সবজি খামারে সবসময় লাভ হয় এমনটি নয়। পেয়ারা চাষ করে খামারের ভেড়া দিয়ে খাওয়াতে হয়েছে এমন দিনও গেছে। সবজির বাজার পড়ে গেলে ক্ষতির শিকার হতে হয়। কিন্তু করোনায় ক্ষতির শিকার কৃষাণী হিসেবে তিনি কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। খামার পরিচালনার জন্য কম সুদে ঋণও পাচ্ছেন না। সরকারি সহায়তা পেলে তিনি আরও এগিয়ে যেতে পারতেন বলে জানান।

কৃষিতে অবদান রাখার জন্য তিনি বিভিন্ন সময় পুরস্কৃত হয়েছেন। ২০১৭ সালে বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদকসহ বেইলি বেগম ২০১১ সালে ভাষা মতিন স্মৃতি পুরস্কার এবং মেয়র পদক পেয়েছেন ২০১২ সালে।
তিনি বলেন, শুধু পদক পাওয়া তার লক্ষ্য নয়, তার লক্ষ্য তার মতো হাজার বেইলি বেগম তৈরি করা।

পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আ. কাদের জানান, বেইলি বেগম একজন অগ্রণী কৃষাণী। তার দেখাদেখি বহু নারী কৃষিতে এগিয়ে এসে সফল হয়েছেন। কৃষকের পাশাপাশি কৃষাণীরাও ব্যাপক অবদান রাখছেন কৃষিতে।

আমিন ইসলাম/এফএ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]